বর্তমান পরিণত হবে দুঃস্বপ্নের স্মৃতিতে

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০৯ এএম

বিশ্বময় যেটা ঘটছে। এ খবরটি তো ওই দিনের সব পত্রিকাতেই রয়েছে যে, নিউ ইয়র্কে যে সফল তরুণ বাঙালি উদ্যোক্তা শহরের অত্যন্ত নিরাপদ এলাকায় বসবাস করতেন তিনি নিহত হয়েছেন। তাকে খুন করার কারণ হলো তার নিজের টাকা চুরির ঘটনা তিনি ধরে ফেলেছিলেন এবং ঘাতকটি হচ্ছে টাকা চুরির দায়ে অভিযুক্ত তারই ব্যক্তিগত সহকারী। নিউ ইয়র্ক শহরে অপরাধ কম হয় না, কিন্তু এ ধরনের অপরাধের কথা আগে নাকি শোনা যায়নি। নিরীহ মানুষটিকে কেবল খুনই করা হয়নি, বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে তার লাশটিকে টুকরো টুকরো করে কাটা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে এ ধরনের একটা মত উঠেছে যে, মানুষের কাজ যন্ত্রকে দিয়ে করানোই সুবিধাজনক। কথাটা নতুন নয়, কিন্তু কথাটা এখন জোরদার হয়েছে। খুব উপকারী যন্ত্র মনুষ্যসদৃশ ড্রোন। ড্রোন দিয়ে যুদ্ধ করা যায়, চিকিৎসাও সম্ভব। ড্রোন তার মালিককে খুন করে না, কথা শোনে। ওদিকে বাংলাদেশে খুব হইচই চলছে ডিজিটালাইজেশন নিয়ে। শিক্ষাবিদরা কেউ কেউ বলছেন অন-লাইন এডুকেশন হ্যাজ কাম টু স্টে। কারও কারও গলায় রীতিমতো উল্লাসের আভাস। কথাটা শুনে ভুক্তভোগী যেহেতু তাই মনে পড়ে যায় জিন্নাহ সাহেবের বিখ্যাত উক্তি; পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠালগ্নে মহা-উৎসাহে তিনি বলেছিলেন পাকিস্তান হ্যাজ কাম টু স্টে। তারপর যত দিন গেছে ততই আমরা পূর্ববঙ্গবাসী ক্রমাগত বর্ধমান মাত্রায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছি পাকিস্তানের ওই স্টেটা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে দেখে। পাকিস্তান গেছে, আশা করব অনলাইন এডুকেশনও যাবে। কারণ অনলাইনে আর যাই করা যাক শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষা সব সময়েই সামাজিক। লাইন ধরে চলে না এবং তার উদ্দেশ্যাবলির কেন্দ্রে থাকে যে অভীপ্সা, তা হলো মানুষকে সামাজিক করা। যন্ত্র এসে মানুষকে হটিয়ে দেবে, অথচ সেই সমাজকে শিক্ষিত মানুষের সমাজ বলব এটা কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু মুশকিল হলো, মানুষের ওপর মানুষের আস্থা কমছে। অর্থাৎ কমানো হচ্ছে। কমাচ্ছে রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র পুঁজিবাদের দাসানুদাস। বাংলাদেশে অতিকষ্টে যে রাষ্ট্রটি আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি, তার ওপর নাগরিকদের আস্থা ক্রমাগত কমছে। নিম্নগমন এখন ভয়াবহ জায়গাতে এসে পৌঁছেছে। একটি জরিপে দেখলাম শিক্ষিত তরুণদের শতকরা আশিজনই জানিয়েছে, তারা রাজনীতিকে অপছন্দ করে। তা পছন্দ করার কোনো কারণ আছে কি? রাষ্ট্র যারা চালান তারা রাষ্ট্রকে তো মানুষের পক্ষে না রেখে বিপক্ষে নিয়ে গেছেন। এই করোনাকালেই তো একজন রাজনীতিক যে কাজ করলেন, তাতে আস্থার ওপর বড় ধরনেরর আঘাত পড়ল। ইনি এমপি এবং সরকার-সমর্থক তো অবশ্যই; তিনি বিদেশে আটক হয়েছেন। বিদেশি সরকার তাকে আটক করেছে মানুষ পাচারের দায়ে। তার স্ত্রীও একজন এমপি। তিনি দেশেই আছেন এবং লোকে বলে দাপটের সঙ্গেই কাজকর্ম করছেন।

তারা জাতীয়তাবাদী ঘরানার। এ ঘরানার রাজনীতির ওপর মানুষের আস্থা থাকার কোনো কারণই আর নেই। কিন্তু বামপন্থিরা? তারা কি আস্থা অর্জন করতে পারছেন? বাম মহলে নেতৃত্ব নেই। নেতৃত্ব যাদের দেওয়ার কথা, সংগ্রামের ভেতর দিয়ে নেতা হিসেবে যারা গড়ে উঠেছিলেন, লোকের আশা ছিল সামাজিক বিপ্লবের আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের অনেকেই এখন নেই। যারা আছেন তাদের কাজ দেখে তরুণরা যদি অনুপ্রাণিত হন তাদের দৃষ্টান্ত অনুসন্ধানে, তবে সেটা খুবই অমঙ্গলজনক হবে। দু-তিনজনের নাম এড়ানো যায় না। যেমন কাজী জাফর আহমদ। তুখোড় বামপন্থি ছাত্রনেতা ছিলেন; ছাত্রজীবন শেষে শ্রেণিচ্যুত হওয়ার অভিপ্রায়ে শ্রমিক এলাকায় বসবাস পর্যন্ত শুরু করেছিলেন। তারপর কোথায় গেলেন হারিয়ে! শুধু হারিয়ে গেলে তবু ভালো ছিল, বিশ্রী বদনাম নিয়ে চলে গেছেন। সে বদনাম বামপন্থিদের প্রতি লোকের আস্থা বাড়ায়নি। তরুণরা একসময় বাম আন্দোলনে যুক্ত হতো; দলে দলে এবং মহা-উৎসাহে। একাত্তরের যুদ্ধ তরুণদেরই যুদ্ধ এবং তারুণ্যেরই যুদ্ধ। পাকিস্তান আমলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্রই যোগ দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়নে। ছাত্র ইউনিয়নই তখন ছিল দেশের সবচেয়ে বড় এবং সর্বাধিক সংগঠিত ছাত্র সংগঠন। একসময় সেই ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে দুই টুকরো হলো; মেনন গ্রুপ ও মতিয়া গ্রুপ। স্বাধীনতার অল্পকাল পরই মতিয়া যোগ দিলেন আওয়ামী লীগে; মেনন অমন দ্রুত পদক্ষেপ নেননি, তবে শেষ পর্যন্ত তিনিও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী জোটে ঠিকই শামিল হয়েছেন। মতিয়া ও মেনন দুজনেই আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, অনুসারীদের পথে ছেড়ে দিয়ে। মন্ত্রিত্বই যদি গন্তব্য হয় বিপ্লবী নেতাদের, তাহলে যারা জানে যে তারা কখনোই মন্ত্রিত্বের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারবে না, তারা কী করে আস্থা রাখবে বামপন্থিদের ওপর? পদস্খলনের আরও বড় বড় দৃষ্টান্ত অবশ্য রয়েছে। মতাদর্শিকভাবে আপসের পথে চলে গেছেন উপমহাদেশের বড় মাপের বিপ্লবীরাও। এম এন রায়ের ঘটনা তো সুবিদিত। তাত্ত্বিকভাবে অগ্রসর ছিলেন, বিপ্লবী উদ্দীপনাও ছিল। ছিলেন মেধাবী, পরিশ্রমী এবং দুঃসাহসী। প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে উদ্যোগ নিয়েছেন। দেশে এসে কারানির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের পথে রইলেন না। কারণ একদিকে পুঁজিবাদের নিপীড়ন, অন্যদিকে তার নিজের জনবিচ্ছিন্নতা। পুঁজিবাদীর নিপীড়নের একটি দিক হলো সুবিধা দেওয়া। এই সুবিধার মধ্যে এমনকি টাকাপয়সার ভূমিকা পর্যন্ত থাকতে পারে, যেমনটা কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ইঙ্গিত করেছেন এম এন রায় সম্বন্ধে। আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বইতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার ভাবতে অবাক লাগে যে এত করে নিজেকে যিনি বিপ্লবের কাজের জন্য প্রস্তুত করলেন, তিনি কী করে সেই বিপ্লবের টাকা আত্মসাৎ করলেন? মানবেন্দ্র নাথ রায় ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার জন্য এবং বিপ্লবের কাজ পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে লাখ লাখ টাকা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল থেকে তুলেছেন।’ বামপন্থিদের পতনটা বেশ মর্মান্তিক ও দৃশ্যগোচর হয়; কারণ তারা পড়লে পড়েন খুবই উঁচু থেকে।

না, তরুণরা আস্থা রাখতে পারছে না। যে জরিপের কথা বলছিলাম তার ওই শতকরা আশিজনই কিন্তু জানিয়েছে যে, তারা দেশে থাকতে চায় না, পারলে দেশ ছেড়ে চলে যাবে। এর কারণও ওই একই। তাদের আস্থা নেই না জাতীয়তাবাদীদের ওপর, না বামপন্থিদের ওপর। কিন্তু তারা যাবেটা কোথায়? বিদেশে কি তাদের ঘরবাড়ি আছে? টাকা জমা আছে কি বিদেশি ব্যাংকে? সেটা পরের কথা, প্রবেশে অনুমতি দেবে কি বিদেশিরা? তা ছাড়া বিদেশ কি নিরাপদ? করোনাভাইরাস কি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েনি? পুঁজিবাদী বিশ্বের কোথাও কি মানুষ নিরাপদে আছে? না, পালানোর জায়গা নেই। পথও নেই। পালিয়ে বাঁচা যাবে না। যেটা করতে হবে সেটা হলো নিজের দেশকেই নিরাপদ করে তোলা, তাকে বদলে ফেলা এবং বদলানোর জন্য জোট বাঁধা।

জোট বাঁধতে হলে প্রথমেই যা করা চাই তাহলো ওই যে ফেল কড়ি মাখো তেল ওই নীতিকে পরিত্যাগ করা। পুঁজিবাদী ভাবাদর্শের মোহ সম্পূর্ণরূপে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া। তার জন্য চাই মওলানা ভাসানীর সেই ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না তা হবে না তা হবে না’ আওয়াজটাই। এটা হিংসার কথা নয়, বাঁচার অধিকারের দাবি। বাঁচার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আওয়াজ এবং অনুসরণ করা দরকার হবে মাও সে তুংয়ের পরামর্শ, ‘শ্রেণি সংগ্রাম ভুলিও না’। অর্থাৎ সংগ্রামটা হবে বৈষম্য ঘুচিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠার।

ওই সংগ্রামের ভেতর দিয়েই পৃথিবী বদলাবে। পুঁজিবাদ যতই অকার্যকর হবে, তার সুবিধাভোগীরা ততই নির্মম হয়ে উঠবে। সব শক্তি কাজে লাগিয়ে দমন-পীড়ন বৃদ্ধি করবে। দেখা দেবে মহা-নৈরাজ্য। পরিবর্তনের কাজটা সুবিধাবঞ্চিতরাই করবে, সঙ্গে থাকবে তারাও যারা বুঝেছে ব্যক্তিগত সুবিধার ব্যবস্থাটা টিকবে না, বরং সামাজিক অগ্রগতিকে প্রতিহতই করবে। বৃদ্ধি করবে নৈরাজ্যের প্রসারকে। সমাজ-বিপ্লবের আন্দোলনের পথ ধরে কেনাবেচার জায়গায় আসবে সমবায়। বিশ্বব্যাপী আওয়াজ উঠবে আর উন্নতি নয়, এখন মুক্তি চাই।

মুক্তির এই আন্দোলনে বিশ্বজনীন অংশগ্রহণ ও সহমর্মিতা থাকবে, কিন্তু এর কোনো একক কেন্দ্র থাকবে না। বিশ্বের সব দেশেই আন্দোলন চলবে। সে-আন্দোলন নৈরাজ্য ঠেকিয়ে সামাজিক বিপ্লবের দিকে এগোনোর। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান অহরহ ঘটবে, পারস্পরিক সাহায্য সমর্থন থাকবে, আধিপত্য থাকবে না তথাকথিত বড় দেশের। ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি, যাবেও না; ইতিহাস এগোবে। মানুষ এমন এক বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করবে যেখানে চলাচল হবে অবাধ, সামাজিকতা থাকবে প্রাণে ভরপুর। কেউ গৃহহীন থাকবে না। দরজায় দরজায় পাহারাদার দেখা যাবে না। গোয়েন্দারা গন্ধ শুঁকে বেড়াবে না গাত্রের। দারিদ্র্য হবে অনুপস্থিত। থাকবে প্রাচুর্য ও অবসর। ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার ফলে যে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক গড়ে উঠবে, তাতে মানুষের সৃষ্টিশীলতা মুক্তি পাবে। উৎপাদনের মান ও পরিমাণ দুটোই বৃদ্ধি পাবে। বিতরণ বাজারি হবে না, হবে সমবায়ী। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বের। নতুন সেই পৃথিবী গড়ার জন্য জোট বাঁধাটাই হবে সব দেশের মানুষের কর্তব্য; দেশের ভেতরে ও বাইরে। নতুন এক আন্তর্জাতিকতা প্রতিষ্ঠা করা চাই, যা সম্পূর্ণ মানবিক এবং বর্তমানের ঘটনাবলি যেখানে পরিণত হবে দুঃস্বপ্নের স্মৃতিতে।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত