‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামে মাইকেল জ্যাকসনের একটি বিখ্যাত গান আছে। এ গানে অসুস্থ, মুমূর্ষু পৃথিবীর কথা বলা হয়েছে এবং পৃথিবীকে নিরাময় করে আরও বেশি বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার আবেদন আছে। বলা হয়েছে আগামী পৃথিবী হবে উজ্জ্বলতর, যেখানে অশ্রু ফেলার প্রয়োজন হবে না, কোনো দুঃখ থাকবে না। গানে আছে, এই আলো ঝিকমিক মিথ্যে পরিবেশে আমরা ‘আতঙ্কবোধ’ উপলব্ধি করতে পারি না। এখানে হৃদয়ের স্থান ও ভালোবাসার কথাও বলা হয়েছে। আরও একটি বিখ্যাত গান আছে মাইকেল জ্যাকসনের ‘দ্য আর্থ সং’। ধরিত্রীর গান। কী হবে সূর্যোদয়ের, কী হবে বৃষ্টির! কী হবে নিহত সবুজ মাঠের! যে রক্তপাত ঘটানো হলো, তার কী হবে যেখানে ধরিত্রী কাঁদছে আর বেলাভূমি ক্রন্দনে নীরব! ধরিত্রীর প্রতি এত অন্যায় কেন করেছি আমরা? আপন সন্তানের জন্য যে প্রশান্তির অঙ্গীকার আমরা করেছি, যে স্বপ্ন দেখিয়েছি বাগানে ফুল ফোটানোর আর ঝলমল নক্ষত্রের তার কী হবে? আমার কেন জানি এখনো মনে হয়, এ কঠিন করোনাকালেও মানবজাতি সুন্দর প্রেম, ভালোবাসা, সংস্কৃতি চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, সৌজন্যবোধ, সততা, জীব প্রেম,
প্রকৃতি প্রেম এসব শেখেনি। বরং সীমাহীন লোভ, নীতিহীন ব্যবসা, অন্যের ক্ষতি করা, মানুষকে ঠকানো ও অপমান করা, বেপরোয়া চালাকি, মিথ্যার বাণিজ্য চলছে। অন্যদিকে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার, নদী, বন, পাহাড় দখলও থেমে নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীর ওপর সহিংসতা, দুর্বলের ওপর আক্রমণ বন্ধ হয়নি। সব মিলিয়ে আমাদের আশা সত্ত্বেও এ করোনা মহামারী খুব বেশি মানুষের মানবিক গুণাবলি জাগিয়ে দিতে পারেনি। এখানেই বর্তমান উন্নয়ন ধারা ও রাজনীতির সমস্যা, যে উন্নয়ন ধারা মানুষকে ও ব্যক্তিকে চরম স্বার্থপরতা ও অন্ধ লোভের কাছে সমর্পিত করে আর নির্বিচারে প্রকৃতি, নদী, বন, বায়ুমন্ডল, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে ধ্বংস করে।
২. পোপ ফ্রান্সিস তার বিভিন্ন সফরের সময় আদিবাসী মানুষের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি চেতনার কথা বলেছেন। ধরিত্রী জননী বা মাদার আর্থ আদিবাসীরা যে সুন্দরভাবে যত্ন করে ব্যবহার করেছেন, এ কথা তিনি বলেছেন। ধরিত্রী জননী এখন অসুস্থ, আক্রান্ত, ক্রন্দনরত। নদী, সমুদ্র, বাতাস, পরিবেশ দূষিত। তার বিখ্যাত এনসাইক্লিক্যাল ‘লাওদাতো সি’তে পোপ ফ্রান্সিস ধরিত্রী, বন, জীববৈচিত্র্য, ইকো-সিস্টেম, সাম্য ও সমতার কথা বলেছেন। ধরিত্রীকে বোনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, আমাদের এ ধরিত্রী বোনটি এখন আহত ও আক্রান্ত হয়ে কাঁদছে আমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে। যারা পোপের বক্তৃতা শোনেন, যারা তার নানা দেশে সফর নিয়ে খবর রাখেন, তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন, তিনি আদিবাসী মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশ, ধরিত্রী, ড্রাগ ও অস্ত্র ব্যবসা, সন্ত্রাস ও আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ, হতদরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ, নারী সমাজ, প্রতিবন্ধী মানুষ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যৌন হয়রানির শিকার বালক-বালিকা, দাসত্বে নিমজ্জিত শ্রম, পতিতাবৃত্তির শিকার নারীসহ সমাজের নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। পোপ তার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে সব মানবজীবন, প্রত্যেক পুরুষ, প্রতিটি নারী, গরিব ক্ষুধার্ত মানুষ, শিশু, সদ্য ভূমিষ্ঠ মানব সন্তান, অনাগত শিশু, কর্মহীন বেকার যুবক, পরিত্যক্ত জনগণ ও ফেলে আসা লোক, এমনকি শরণার্থীসহ সব মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও অধিকারের কথা বলেছেন।
৩. লেটিসিয়া ঘোষণাপত্র শিরোনামে বৈশ্বিক পর্যায়ে আদিবাসীদের একটি ঘোষণাপত্র আছে। ঘোষণাপত্রের শুরু এভাবে, ‘সব মানুষের আগমন ঘটেছে বন থেকে, ভূমি থেকে। বন মরে গেলে মানুষ মরে যায়। আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বিশ্বের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার, একে মমতা-ভালোবাসা দিয়ে যত্ন করার। যখন এ প্রকৃতির কোনো একটি অংশকে ধ্বংস করা হয়, তখন সব ভারসাম্য লন্ডভন্ড হয়ে যায়। যখন বনের শেষ বৃক্ষ কেটে ফেলা হবে, যখন শেষ নদীটি শুকিয়ে যাবে, তখন মানুষ শিখবে যে সোনা ও রুপা খেয়ে জীবন বাঁচে না। সঠিক ও নির্লোভভাবে প্রকৃতিকে, বন ও ভূমিকে ব্যবহার করার ভার আমরা পেয়েছি পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে, যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একে রক্ষার ভার আমাদের দিয়ে গেছেন।’ অস্থির পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষের অপরিণামদর্শী ও সীমাহীন লোভ-নিষ্ঠুরতার কাছে আদিবাসী সমাজ আজ বিপন্ন, অসহায়। প্রকৃত বিচারে ধরিত্রীর সব প্রাণীই আজ বিপন্ন।
৪. আমরা একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সবার জন্য ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিলাম। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অংশে ২৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ এ সুন্দর কথাগুলো স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছর ধরে সংবিধানের অলংকার ও শোভা হয়েই রয়ে গেছে। আদিবাসী দরিদ্র প্রান্তিক মানুষের জীবনে, গরিব অসহায় বাঙালি কৃষকের জীবনে, দলিত ও চা শ্রমিকের জীবনে, হাওর অঞ্চলের মানুষ, নৌকার মাঝি, বস্তিবাসী, রিকশাচালক, পথশিশু, তৃতীয় লিঙ্গ, গার্মেন্টস কর্মী, চরাঞ্চলের মানুষসহ অগণিত শ্রমজীবী মানুষের জীবনে এসব কথার প্রতিফলন কি আছে? বরং সীমাহীন বৈষম্য, অবিরাম ভূমি হারানো, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারহীনতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব, সুশাসনের দৈন্যদশা আদিবাসী প্রান্তিক মানুষকে আরও বেশি অসহায় করে তুলেছে। আমরা বহু বছর ধরে বলছি আদিবাসী অধিকার মানবাধিকার ও মানব মর্যাদার অংশ। এ করোনার মহামারীতে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আদিবাসী জনগণ এখন কঠিন সময় পার করছে। ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও অবিচারের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে নিজের অধিকার ও উন্নয়নের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে না থাকার। আদিবাসীদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকার জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হলেও এটি শুধু কাগজে কলমে রয়ে গেছে অনেক দেশে। তাই নীরব দর্শক হয়েই, অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করেই তাদের কোনোরকম টিকে থাকতে হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণই নেই। এখানেই মাইকেল জ্যাকসনের ওই গানেই বক্তব্য হচ্ছে, শুধু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নয়, মর্যাদা নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে, ‘উই স্টপ এক্সিস্টিং অ্যান্ড উই স্টার্ট লিভিং’।
৫. এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি আমরা। সাঁওতালদের ওপর হামলা ও হত্যার বিচার হলো না। লংগদুতে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের সুরাহা সুদূরপরাহত। খাসিয়াদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার এখনো মিলল না। মধুপুরে বনে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা এখনো বহাল আর আদিবাসী গারো-কোচ-বর্মণ মানুষ কাগজপত্রে অবৈধ বাসিন্দা হয়ে আছে। উপকূল অঞ্চলে রাখাইনরা হারিয়ে যেতে যেতে চিরতরে বিলীন হওয়ার উপক্রম। তারা নিজভূমে এখন সংখ্যালঘু আর অসহায় জাতিতে পরিণত। সরকার বিরামহীন ক্লান্তিহীনভাবে বলেই চলেছে, উন্নয়নের জোয়ার চলছে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে চলছে উন্নয়ন। এই উন্নয়ন যে প্রবল বৈষম্যপীড়িত, নীতিহীন ও দুর্বিনীত, এ কথা শুধু কিছু মানুষ ক্ষীণ কণ্ঠে বলার চেষ্টা করছেন। আর এ অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন সত্যি টেকসই হবে কি না, এ প্রশ্নও রাখলাম। আর কী লাগামহীন দুর্নীতি এখানে রয়ে গেছে, ব্যাংক লুটপাট হয়ে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, সে কথা তো সবাই আমরা জানি।
আমরা চাই উন্নয়ন হোক, অবশ্যই হোক। তবে এ উন্নয়নের অংশীদার হতে হবে সাধারণ মানুষকে, যাকে আমরা বলি আত্ম-নিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন, সেলফ ডিটারমাইন্ড ডেভেলপমেন্ট। এ প্রচারিত অদম্য উন্নয়নের জোয়ারে প্রকৃতপক্ষে যেন আদিবাসী জনগণ, গরিব প্রান্তিক কৃষক, দলিত হরিজন, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ, চা বাগানের শ্রমিকসহ লাখ লাখ মানুষ ভেসে না যায়। সাধারণ মেহনতি মানুষের উপকার ও কল্যাণই যেন উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সাধারণ গরিব মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই হোক অর্থ ব্যয়ের প্রতিফলন। উন্নয়ন ও মানবাধিকার যেন পাশাপাশি চলে। আর প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য যেন অতি গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজিতে জাতিসংঘ আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের কথা বলছে। এখানেও আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
৬. পৃথিবীর নানা দেশ আদিবাসী অধিকার ইস্যুতে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। নরওয়েসহ স্ক্যানডিনেভিয়ান কয়েকটি দেশে আদিবাসী সামি পার্লামেন্ট আছে। নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, জাপান, তাইওয়ান, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ চেষ্টা করছে আদিবাসীদের অধিকার প্রদানের। অস্ট্রেলিয়া সরকার অতীতের ভুল আচরণের জন্য পার্লামেন্টে আদিবাসীদের কাছে ঐতিহাসিক ক্ষমা চেয়ে বলেছে, ‘এই ক্ষমা প্রার্থনা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আমরা একে অন্যের যাতনা বুঝতে পারব এবং সামনে অগ্রসর হতে পারব।’ আমেরিকা, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড সরকারও তাদের অতীত ভুল আচরণের জন্য আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। আইএলও কনভেনশন ১৬৯ র্যাটিফাইয়ের বেলায়ও তারা শীর্ষে। বলিভিয়া জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রকে রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করেছে। শুধু তাই নয়, ২০০ বছরের ইতিহাসে চারুগুয়া প্রদেশে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার চালু করেছে। ২০১৬ সালে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট টাই ইং-ওয়েন দেশের আদিবাসীদের কাছে রাষ্ট্রের চার দশকের বৈষম্যমূলক আচরণ ও দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। নামিবিয়াও ক্ষমা প্রার্থনা করেছে আদিবাসী জনগণের কাছে। আপনারা জানেন, পাকিস্তানেও প্রাদেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা আছে ট্রাইবালদের জন্য, যা চিত্রল, দির, সোয়াট, খাইবার, কারাম, নর্থ ওয়ারিজিস্তান প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত। স্বশাসনের সবচেয়ে ভালো নমুনা হলো নর্থ ইস্টসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল রাজ্যসমূহের আদিবাসী অঞ্চলগুলো।
৭. আমরা আগামী বছর স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করব। আমি নিজে একাত্তরে পরিবারের সঙ্গে উদ্বাস্তু বালক ছিলাম ভারতের মেঘালয়ে। নিশ্চয় স্বাধীনতার শতবছর পূর্তিতে আমি এ জগতে থাকব না। তবে এটিও আমাদের পরম সৌভাগ্য যে সুবর্ণজয়ন্তীতে থাকব আমরা। আশা করব আমরা একসঙ্গে আদিবাসী-বাঙালি মিলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে আনন্দ উদযাপন করতে পারব।
লেখক কলামনিস্ট ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম
