বাসভবনে ঢুকে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা ‘চুরির ঘটনা নয়’ উল্লেখ করে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, এটি পরিকল্পিত আক্রমণ। গতকাল শনিবার রাজধানীর দিলু রোডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম) মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার প্রতিবাদে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গত বুধবার গভীর রাতে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলীর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। র্যাব বলছে, এ ঘটনায় আটক তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ‘চুরির অভিপ্রায়’ থেকেই নৃশংস এ হামলা হয় বলেও দাবি করেছে তারা। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য আরও সময় দিতে হবে, আরও তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজনে সম্পৃক্তদের রিমান্ডে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে র্যাব।
চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলায় ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলা হয়েছে এ কথা মানতে নারাজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা তদন্তকারী দলগুলোকে নিজেদের মতামত ও পর্যবেক্ষণ জানাবে। সংবাদ সম্মেলনে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুনের মামলার প্রসঙ্গটিও উঠে আসে।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি কিছু কিছু দুর্বৃত্ত ও সমাজবিরোধী ব্যক্তি এ সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা বেআইনি কাজ করতে ব্যর্থ হয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা ও মামলা-মোকদ্দমা দায়ের করে সদস্যদের মনোবল দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রকৃত অর্থে এতে ক্ষতি হচ্ছে দেশ ও জনগণের।’
কোনো কোনো মহল ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ‘বিচ্ছিন্ন ও চুরির ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে বলে দাবি করেন হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ‘অ্যাসোসিয়েশন মনে করে এটি কোনো চুরির ঘটনা নয়। কারণ দুর্বৃত্তরা কোনো জিনিস বা সম্পদ চুরি করেনি বা খোয়া যায়নি। এমনকি তার (ওয়াহিদা খানম) বিছানার ওপর পড়ে থাকা মোবাইলটিও নেয়নি। এটি একটি পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনা এবং এর সঙ্গে আরও অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন।’
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম একজন সৎ, নির্ভীক কর্মকর্তা। তিনি কোনো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল তার ওপর বেআইনি তদবিরে ব্যর্থ হয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং ঘটনা তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াহিদা খানম তেমন কোনো চাপে ছিলেন বা অস্বস্তিতে আছেন বলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে শেয়ার করেননি।’
হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আরও একটি বিষয় আমরা আপনাদের অবহিত করতে চাই, ইতিমধ্যে আপনারা শুনেছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুনের বিরুদ্ধে কতিপয় অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির প্ররোচনায় ফৌজদারি আদালতে মামলা হয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিআইবির কাছে প্রেরণ করেছে। অসংলগ্ন কথাবার্তায় ভর্তি এ রকম একটি আরজির ভিত্তিতে একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে মামলা নজিরবিহীন এবং দুর্ভাগ্যজনকও বটে।’ এভাবে মামলা গ্রহণ করা হলে জেলা প্রশাসক কী করে তার দায়িত্ব পালন করবেন এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে মামলাটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারসহ মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’
ইউএনওদের নিরাপত্তায় ব্যাটালিয়ন আনসার নিয়োগ প্রসঙ্গে হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সব জেলাতে ব্যাটালিয়ন আনসার নেই। যেসব জেলাতে আছে, আমরা সেখানে জেলা ও উপজেলা প্রশাসকদের নিরাপত্তার জন্য ব্যাটালিয়ন আনসার নিয়োগ দেওয়ার আবেদন জানাব।’
সংগঠনের মহাসচিব ও জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, ‘আমরা দেখেছি ইউএনও ওয়াহিদা ইদানিং কিছু উচ্ছেদ করেছেন। আরও কিছু উচ্ছেদ করার জন্য কিছু লোকজন তার ওপর সংক্ষুব্ধ হয়েছেন। ওখানে যে বালুমহালে অবৈধভাবে বালু তুলত সে বাধা দিয়েছিল। এসব কারণে প্রভাবশালী কেউ হয়তো তার ওপর ক্ষিপ্ত হতে পারেন। সেটির বহির্প্রকাশ এভাবে হতে পারে বলে আমরা মনে করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটি তদন্ত করছে, সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে উদ্দেশ্য করে আমরা কিছু বলতে পারছি না।’
জনপ্রশাসন সচিব বলেন, ‘উপজেলাতে বিভিন্ন পেশা ও সংগঠনের লোকজন থাকেন। মানুষের চাহিদা অফুরন্ত হয়ে গেছে। সে চাহিদার মধ্যে কোনটা আইনি, কোনটা বেআইনি এটা কিন্তু তারা অনেক সময় বাছ-বিচার করেন না। আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মকর্তা ইউএনওরা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে থাকেন। মোবাইল কোর্ট থেকে শুরু করে আইনের প্রতিটি বিষয় উনি দেখভাল করে থাকেন, যেন কোথাও আইনের ব্যত্যয় না হয়। কোথাও আইনের ব্যত্যয় করে যদি কিছু আবদার করা হয়, তখন অনেকে ইউএনওর বিরাগভাজন হন।’
ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় আটকদের রাজনৈতিক পরিচয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এলেও ‘তদন্তের স্বার্থে’ এ নিয়ে কিছু বলতে চাইছেন না অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইউসুফ হারুন বলেন, ‘এই দুর্বৃত্তদের কেউ রাজনৈতিক দলে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে। আমরা দেখেছি, যেসব লোকজন এই দুর্বৃত্তায়ন করে, তাদের যে সবসময় রাজনৈতিক প্রভাব থাকে এ রকম না। অন্য জায়গা থেকে এসেছে, অন্য দল থেকে এসেছে, তারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ রকম রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নিয়ে এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে।’
সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মেজবাহ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
