কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ওষুধ, বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা এবং চিকিৎসক-নার্সদের থাকা-খাওয়া বাবদ কয়েকগুণ বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
কমিশনের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. সারোয়ার আলমকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি জমা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল রবিবার দুদক পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
দেশ রূপান্তরের হাতে থাকা দুদকের বিভিন্ন নথির অভিযোগ অনুযায়ী, কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সেহাব উদ্দিন রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের সঙ্গে আঁতাত করে চিকিৎসক-নার্সদের জন্য হোটেল কক্ষের ৩ হাজার টাকা ভাড়া ৬ হাজার টাকা নেন। জনপ্রতি প্রতিবেলার খাবার বিল নেন ৪৫০ টাকা। ডা. সেহাব মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে হাসপাতালের চিকিৎসকদের বনানীর হোটেল লেকশোর, উত্তরার ম্যাপেল লিপে সাড়ে ৮ হাজার টাকা নিতেন। বাড়তি ভাড়া আদায় করে পরে সেগুলো নিজে নিতেন তিনি। মিলিনা হোটেলে খাবার বাবদ দেড় লাখ টাকা দেন সাহেদকে। তার কারণে দুই মাসে সরকারের অতিরিক্ত ৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়। আর ডা. সেহাবের অপকর্ম ঢাকতে সাজু ও ইশতিয়াক নামে ঠিকাদারদের একটি চক্র মাঠে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হাসপাতালের সব যন্ত্রপাতি ও ওষুধ অন্তত ১০ গুণ বেশি দামে ডা. সেহাব আত্মীয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করেন। চিকিৎসকদের চাহিদাপত্র বাদ দিয়ে নার্সদের থেকে চাহিদাপত্র নিয়ে জিএম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেন তিনি। ওইসব ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ না করেও তিনি স্টোরকিপারকে ঘুষ দিয়ে এন্টি করান। চিকিৎসকদের পরিবর্তে নার্সদের মাধ্যমে সেগুলো ব্যবহার দেখিয়ে পরে বিল তুলে নেওয়া হয়।
ডা. সেহাব ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সব যন্ত্রপাতি ৫-১০ গুণ বেশি দামে ডিপিএম (ডাইরেক্ট টেন্ডার মেথড) পদ্ধতিতে তার পছন্দের লোক দিয়ে একক প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেন। ২৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি পিসিআর মেশিনের বিল দেওয়া হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। হাসপাতালের মাল্টিপারপাস পেশেন্ট মনিটরের দাম ধরা হয় ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ এ যন্ত্রের সর্বোচ্চ দাম ৮ লাখ টাকা। হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলিমুজ্জামান এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়।
ডা. সেহাব জিএম ট্রেডার্স ইন্টারন্যাশনালসহ আরও দুটি কোম্পানি সাজিয়ে ৭ কোটি টাকার ভুতুড়ে বিল বানিয়ে তা আত্মসাৎ করেন। আর হাসপাতালের পরিচালক ডা. সারোয়ার আলম কোনো সম্মতি ছাড়াই বিল তুলে নেন।
করোনা সংক্রমণের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এসব কেনাকাটা হলেও গত ২৬ আগস্ট হঠাৎ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেহাব ক্রয় কমিটির দুই সদস্য ডা. সোহেলী পারভীন ও ডা. মামুনুর রশীদ থেকে পুরনো তারিখে কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেন।
এ বিষয়ে ডা. সোহেলী পারভীন বলেন, ‘২৫ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক ফোন করে আমাকে হাসপাতালে যেতে বলেন। পরদিন হাসপাতালে গেলে কতগুলো কাগজে স্বাক্ষর নেন তিনি। এগুলো কী ধরনের কাগজ, তা পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। স্বাক্ষরগুলো ছিল, মার্চ থেকে মে মাসের বিভিন্ন তারিখের।’
এ বিষয়ে দুদক পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ‘কমিশনের চিঠিতে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে ক্রয় কমিটির দুই সদস্য থেকে পুরনো তারিখে স্বাক্ষর নেওয়া বিল-ভাউচারসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে তারা নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি ক্রয় ও সরবরাহ করেন। চিকিৎসকদের হোটেলে থাকা-খাওয়ার নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন। বিভিন্নজনের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে চক্রের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। এসব অভিযোগ সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে।’
দুদকের তলব করা রেকর্ডপত্রের মধ্যে রয়েছে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যেসব স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী (মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার ও অন্যান্য দ্রব্যাদি) এবং চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনা হয়েছে তার আইটেমভিত্তিক বিবরণ, ব্যয়কৃত টাকার পরিমাণ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, ক্রয় কমিটির তথ্য, বর্ণিত স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি ক্রয়-সংক্রান্ত নথি ও নোটশিটের সত্যায়িত ফটোকপি, বর্ণিত স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি সরবরাহের জন্য বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কী পরিমাণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে তার তথ্য এবং মজুদ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদির তথ্য।
এছাড়া করোনাকালে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনে হোটেলগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি, হোটেলে অবস্থানকারীদের তালিকা (হোটেলভিত্তিক), হোটেল ভাড়া ও খাবার বাবদ পরিশোধ করা বিলের তথ্য, নোটশিটসহ সংশ্লিষ্ট নথির ফটোকপি চাওয়া হয়েছে।
