শিবলী ও সাহানশাহকে জেরা করলেই রহস্যভেদ

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:১২ এএম

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলীর ওপর হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়েও দিয়েছে। সদ্য বহিষ্কৃত এক যুবলীগ নেতাসহ ইউএনও ওয়াহিদা হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার ওই তিন আসামি ‘চুরির উদ্দেশ্যে’ ইউএনও’র সরকারি বাসভবনে গিয়েছিল বলে র‌্যাবকে জানিয়েছে। কিন্তু ঘোড়াঘাটের অধিকাংশ মানুষ র‌্যাবের কাছে আসামিদের দেওয়া ওই জবানবন্দি বিশ্বাস করতে পারছেন না। এলাকাবাসীর অনেকেরই ধারণা, স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) শিবলী সাদিক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রাফে খোন্দকার সাহানশাহর মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছেন ইউএনও ওয়াহিদা। ঘোড়াঘাটের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ধারণা, ক্ষমতার জানান দেওয়াই ইউএনওর ওপর হামলার অন্যতম কারণ। ইউএনওর ওপর হামলার বিষয়টি নিছক চুরির উদ্দেশে করা হয়নি। বরং কোনো এক পক্ষের সঙ্গে ইউএনও ওয়াহিদার বনিবনা না হওয়ার কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় অনেকেই বলছেন, শিবলী ও সাহানশাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই ইউএনওর ওপর হামলার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।

এর আগে গত শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘সাহানশাহর মুল্লুকে বাধা ছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই সংবাদে বলা হয়, বালুমহাল, খাসজমি দখল, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিতে নানা সময়ে বাধা ও মতের অমিল ঘটায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করছেন এলাকাবাসীর অনেকেই। তবে হত্যার উদ্দেশে, না শুধু ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে সে সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন। তবে গত বুধবার গভীর রাতে ইউএনওর বাসভবনে হামলার ঘটনাটি যে পরিকল্পিত ছিল সে বিষয়ে তারা অনেকটা নিশ্চিত। আর এসবের মূল মদদদাতা হিসেবে নাম উঠে আসে ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাহানশাহর। দেশ রূপান্তরের সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে সাহানশাহসহ স্থানীয় অন্য নেতাদের বিষয়ে। উপজেলা আওয়ামী লীগের এই নেতার নানা অপকর্মের বিষয়ে একের পর এক বিভিন্ন তথ্য বেরিয়ে আসে। গত উপজেলা নির্বাচনে সাহানশাহর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ আছে বিস্তর। গত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি থেকে কোনো প্রার্থী না থাকায় ঘোড়াঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শুভ রহমান চৌধুরী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের কাগজপত্র জমা দিতে গেলে রাস্তায় তার কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা! পরে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান হন সাহানশাহ। কাগজপত্র ছিনতাইয়ের ঘটনায় ওই সময় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শুভ রহমান চৌধুরী দিনাজপুর জজকোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন। যেখানে আসামি করা হয় বদরুল ও সুজনসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে। তার মধ্যে বদরুল ছিলেন ঘোড়াঘাট উপজেলার ১ নম্বর বুলাকীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এই ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন সদ্য বহিষ্কৃত যুব লীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও বর্তমান ঘোড়াঘাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইউনুস ম-ল! বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মাদক, চাঁদাবাজি, হামলা ও জমি দখলসহ আছে নানা ধরনের অভিযোগ। আবার ইউনুস ম-লকে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে নিয়ে এসে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ দেওয়ার অভিযোগও আছে সাহানশাহর বিরুদ্ধে। মূলত সাহানশাহকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার জন্যই কোনো প্রার্থীকেই নির্বাচন করতে দেননি সাহানশাহর বাহিনী। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদটি পেয়ে যান আওয়ামী লীগ নেতা সাহানশাহ। তিনি বর্তমান মেয়াদ মিলিয়ে তিনবার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন করেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয়বার হেরে গেলেও তৃতীয়বার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জনপ্রিয়তা না থাকলেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শেষবারের মতো উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে সক্ষম হয়েছেন সাহানশাহ। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তার ক্ষমতা বেড়ে যায় বহুগুণে। একদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, আবার অন্যদিকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় ক্ষমতার আকাশচূড়ায় পৌঁছে যান সাহানশাহ। দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে নিজের পছন্দের প্রার্থীর বাইরে কাউকেই প্রার্থী হতে দেননি তিনি। এই ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন চেয়ারম্যানের পছন্দের প্রার্থী মান্নান ম-ল। এই মান্নান ম-লের নামে আছে চাল চুরির অভিযোগ। চাল চুরির অপরাধে স্থানীয়রা মান্নান ম-লের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলেন। যার একটি ভিডিও ক্লিপ দেশ রূপান্তরের কাছে আছে।

এদিকে ঘোড়াঘাট উপজেলার কোটি টাকার রানীগঞ্জ হাট সাহানশাহ উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইজারা নেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের নামে। এখানেও কাউকেই কর্র্তৃত্ব খাটাতে দেননি তিনি। সিংড়া ইউনিয়নের বড় বড় পুকুর একাই নিজের নামে বা পরিবারের কারও নামে ইজারা নিয়ে থাকেন সাহানশাহ। এখানেও অন্য কাউকে টেন্ডার বা ইজারার কোনো ধরনের সুযোগ দেন না এই আওয়ামী লীগ নেতা। স্থানীয়রা বলছেন, সাহানশাহর বিরুদ্ধে কথা বলার মতো এলাকায় কেউ নেই।

উপজেলার ১ নম্বর বুলাকীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ওই সময়ের ইউপি চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন প্রধান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কারণে তাকে বুদ্ধি খাটিয়ে দল থেকে বহিষ্কার করান সাহানশাহ। তিনি ক্ষমতাবলে নিজের স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ এর পরিচালক পদে নির্বাচন করান। সেখানে তার স্ত্রী পরিচালক নির্বাচিত হন। এছাড়াও রানীগঞ্জ মহিলা কলেজে দপ্তরি পদে চাকরি করেন সাহানশাহর স্ত্রী। অভিযোগ আছে, দপ্তরি পদে চাকরি করলেও সাহানশাহর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো আসেন না।

উপজেলার রানীগঞ্জ সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি পদে দীর্ঘদিন ধরে আছেন সাহানশাহ। সভাপতি পদে অন্য কাউকে প্রার্থী হতে দেন না বলেও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষমতাবলে ওই কলেজে পরিবারের অনেক লোকজনকে চাকরি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইউএনওর ওপর সাহানশাহর ক্ষোভ থাকতে পারে অন্য আরেকটি কারণে। গত উপজেলা নির্বাচনে সাহানশাহর সহযোগী শের আলী ওরফে শের ভোট চলাকালীন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পক্ষে জাল ভোট দিচ্ছিলেন। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে হাতেনাতে আটক করে। পরে সেখান থেকে ইউএনওর কাছে নিয়ে যাওয়া হয় শের আলীকে। চেয়ারম্যান সাহানশাহ শের আলীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ইউএনওর কাছে তদবির করেছিলেন। কিন্তু ইউএনও ওয়াহিদা খানম সেই তদবির না শুনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে শের আলীকে জেলহাজতে পাঠান। তখন থেকেই ইউএনও ওয়াহিদার ওপর একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল সাহানশাহর।

সন্ত্রাসী বাহিনী লালন-পালন করার কারণে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের। এর আগে ২ নম্বর পালসা ইউনিয়নের সাবেক যুবলীগ সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম বাবুর নেতৃত্বে ময়নুল ও ফয়সাল প্রধানদের আক্রমণের শিকার হন ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলাম। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের। মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক, উপজেলা চেয়ারম্যান সাহানশাহ, পৌর মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলন ও বিএনপি থেকে আসা নব্য আওয়ামী লীগার ইউনুস ম-লের চতুর্মুখী চাপে পড়েন ইউএনও ওয়াহিদা খানম। স্থানীয়দের ধারণা, এই চতুর্মুখী চাপেই কোনো একপক্ষ ইউএনওকে শায়েস্তা করার জন্য নতুবা হত্যা করার উদ্দেশে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব বিষয় তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানান স্থানীয় সাধারণ মানুষ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রাফে খোন্দকার সাহানশাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলব না।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিককে বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত