ভার্জিনিয়া ওয়েড : বিলি জিনকে হারিয়ে ইতিহাস

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:২৩ এএম

ক্রিকেটের মতো টেনিসেও শ্রেণি বিভাজন ছিল। পেশাদাররা গ্র্যান্ডসø্যাম টুর্নামেন্টে অ্যামেচারদের সঙ্গে খেলতে পারতেন না। আসলে খেলতে দেওয়া হতো না। সেই শ্রেণি বিভাজন ঘোচে ১৯৬৮ সালে। পেশাদার-অ্যামেচারের সম্মিলনে শুরু হয় ‘ওপেন এরা’ বা ‘উন্মুক্ত যুগ’। ১৯৬৮ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেন দিয়ে শুরু হয় সেই যুগের। সেই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর ইউএস ওপেনের নারী এককের প্রথম শিরোপা জিতেছিলেন ব্রিটেনের ভার্জিনিয়া ওয়েড। ফাইনালে ৬-৪, ৬-২ গেমে হারিয়েছিলেন কিংবদন্তির বিলি জিন কিংকে। যিনি আগের বছরই জিতেছিলেন শিরোপা।

ভার্জিনিয়া ওয়েডের ইতিহাস নির্মাণে ভাগ্যের অবদান ছিল। ঐতিহ্যগত ভাবেই ইউএস ওপেনের পুরুষ এককের ফাইনাল হয় ৮ সেপ্টেম্বর। এর একদিন আগে হয় নারী এককের ফাইনাল। কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া বহুকাল থেকে এই প্রথাই চলে আসছে। করোনা আঘাত না হানলে এবারের ইউএস ওপেনও গতকালই শেষ হয়ে যেত। তো, ১৯৬৮-তে আর্থার অ্যাশের আগেই ভার্জিনিয়া ওয়েড প্রথম ফাইনাল জিতে ওপেন যুগের চ্যাম্পিয়নের খাতায় নাম লেখান। পরের দিন টম ওকেরকে ১৪-১২, ৫-৭, ৬-৩, ৩-৬, ৬-৩ এ হারিয়ে পুরুষ এককে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন আর্থার অ্যাশ।

ওয়েড ইউএস ওপেন জিতেছেন ওই একবারই। কোনোদিন ফরাসি ওপেন জিততে পারেননি। একবার করে জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন আর উইম্বলডন (১৯৭৭-এ)।

ভার্জিনিয়া ওয়েডের উইম্বলডন জয় এসেছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের রজতজয়ন্তীর বছরে। ইউএস ওপেন জয়ের ৯ বছর পর অল ইংল্যান্ড গ্রাস কোর্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি। তিনিই উইম্বলডন জয়ী প্রথম ব্রিটিশ নারী। যেদিন জেতেন সেদিন ছিল উইম্বলডনের শতবর্ষ। শিরোপা জয়ের পর গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, ‘শিরোপা জয়টা আমার ক্যারিয়ারকে মহিমান্বিত করেছিল।’ যদিও রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিলভার জুবিলি নিয়েই মেতে ছিল ইংল্যান্ড। তাই ধারণা করা হয় ওয়েডের কপালে তেমন প্রচার জুটবে না। কিন্তু সেন্টার কোর্টে রানীর হাত থেকেই উইম্বলডন ট্রফি নিয়েছিলেন ওয়েড।

৭৭-এ উইম্বলডন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ছিলেন ক্রিস এভার্ট। সেমিফাইনালে তাকে হারিয়ে ওয়েড মুখোমুখি হন বেটি স্টোভের। আগেই শুনেছিলেন উইম্বলডনের ফাইনাল দেখতে সেন্টার কোর্টে আসবেন রানী। তাছাড়া ওটা ছিল শতবর্ষের উইম্বলডন। দুটি কারণ একসঙ্গে মিলে যাওয়ায় উজ্জীবিত ছিলেন ওয়েড। পরে স্মৃতিচারণমূলক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সিলভার জুবিলি আর উইম্বলডন শতবর্ষের কারণে আগে থেকেই উদ্দীপ্ত ছিলাম। যখন শুনলাম ফাইনালের দিন রয়্যাল বক্সে উপস্থিত থাকবেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তখন সেই উদ্দীপনা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। মনে মনে বলেছিলেন, তিনি থাকবেন তাই ফাইনালে আমাকেও থাকতে হবে।’ ভার্জিনিয়া ওয়েড চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই উৎফুল্ল ছিল সেন্টার কোর্টের গ্যালারি। যখন রানী নিজেই বিজয়ীর হাতে ট্রফি প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন তখন উচ্ছ্বাস এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ওয়েড কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না। ‘রানীর কথা আমি কিচ্ছু শুনতে পাইনি। মনে হচ্ছিল ভেরি ওয়েল ডান টাইপের কিছু একটা তিনি বলছেন। শুনেছিলাম রানী টেনিসে খুব উৎসাহী ছিলেন না। চেঁচামেচি আর আনুষ্ঠানিকতা হয়তো তাকে বিরক্তই করে থাকবে। সাতাত্তরের পর আমার জানা মতে তিনি আর  উইম্বলডন ফাইনাল দেখতে যাননি। সেবারই তিনি প্রথমবারের মতো রয়্যাল বক্সে উপস্থিত হন। আমি যদি জিততে না পারতাম খুব ট্রাজিক ব্যাপার হতো। হয়তো সে কারণেই জিতেছিলাম।’

ভার্জিনিয়া ওয়েড ৪০ বছর টেনিস খেলেছেন। ইউএস ওপেন জয়ের ৪ বছর পর ১৯৭২-এ জেতেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন। এরপর ৭৭-এর ওই উইম্বলডন। পরে ধারাভাষ্যকার এবং কোচ হিসেবেও সফল হয়েছেন। উদ্দীপনামূলক বক্তৃতাও দেন। বয়স প্রায় ৭৫ পেরিয়ে গেছে। এখনো টেনিস বলে র‌্যাকেটের আঘাতে শিহরিত হন, ‘আমি এখনো টেনিস ভালোবাসি। হয়তো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারব না, তবে বলে হিট করতে আনন্দ পাই। এখনো টেনিস কোর্ট আমার জন্য সেরা অনুশীলন ক্ষেত্র। অবসাদ মুক্তির জায়গাও। কোর্টে আমি সব প্রশ্ন, উদ্বেগ, সংকট ঝেড়ে ফেলতে পারি। না খেললেও কোর্টের এই কর্মউদ্দীপনা আমাকে সজীব রাখে।’

৫ ফিট আট ইঞ্চির ওয়েড সাবলীল ব্যাকহ্যান্ড আর টপ স্পিনে এক সময় প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখতেন। ২৬ বছরের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে সিঙ্গেল শিরোপা জিতেছেন ৫৫টি। সর্বকালের সেরার তালিকায় এখনো অষ্টম। কিন্তু রেকর্ড ছাপিয়ে ভার্জিনিয়া ওয়েড মানে এখনো আটষট্টি আর সাতাত্তর। এই দুটি বছরে তার দুটি অর্জনের ইতিহাস এমনই চিরস্থায়ী যে কোনোদিন মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত