দারিদ্র্য বিমোচনের বদলে দুর্নীতির মচ্ছব

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৩৪ এএম

সংস্থার নাম পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ)। গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, নারী-পুরুষ সমতার বিকাশ এবং নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা এবং নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে ২০০০ সাল থেকে এর কার্যক্রম শুরু করা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বিগত সময়ে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা, সঞ্চয়ের মাধ্যমে পুঁজি গঠন, আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকা-ে দক্ষতা উন্নয়নে সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী অধিকার প্রভৃতি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ড যথেষ্ট সুনামও কুড়িয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখার বদলে সীমাহীন দুর্নীতির মচ্ছবে মেতে ওঠে সংস্থাটি। জবাবদিহি এড়াতে গত আড়াই বছরে কোনো বোর্ড সভাই হয়নি পিডিবিএফের। সম্প্রতি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে পিডিবিএফের ভয়াবহ সব দুর্নীতির বিস্তারিত উদঘাটিত হয়।

গত পহেলা সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘ঝুঁকিতে পিডিবিএফের ২৭০ কোটি টাকা’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে সংস্থাটির অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোনো প্রকার বোর্ড মিটিং ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে দুটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ এই অর্থ জমা রাখেন সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মদন মোহন সাহা। রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস নামের ওই প্রতিষ্ঠান দুটি এখন টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তারা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চাচ্ছে। তবে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান দুটি আসলেই টাকা ফেরত দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্পে নানা অনিয়ম এবং কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। এরপর চলতি বছরের ৫ আগস্ট পিডিবিএফের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মদন মোহন সাহাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।  কিন্তু সংস্থাটির আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা তথ্যপ্রমাণ মিললেও এখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। 

সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়’ শিরোনামে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে পদে পদে অনিয়ম বিষয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায় পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনে ৮৮ কোটি ৮৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকার কেনাকাটায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ (পিপিআর) মানা হয়নি। আর এ কারণে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ৫২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এদিকে, একটি প্রকল্পে সৌরশক্তি প্যানেল না বসিয়েই তুলে নেওয়া হয়েছে ২১ লাখ টাকার বিল। আর ঠাকুরগাঁওয়ে ১৭ লাখ টাকার টিআর তুলে ১৩ লাখ টাকা জমা দিয়ে বাকি ৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তা। সরকারি প্রকল্প থেকে অর্থ প্রক্রিয়াকরণের নামে অবৈধভাবে পাঁচ ভাগ খরচ দেখানো হচ্ছে, যা মূলত কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে অনিয়মের মধ্য দিয়ে বিতরণ করা ২৩ কোটি টাকার মধ্যে ১৫ কোটি টাকা আদায়ের আশাই ছেড়ে দিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বেশিরভাগই দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসার পরও কেন তাদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মদন মোহন সাহাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও দুর্নীতির অপরাধে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক বেগম মনিজা বেগমের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় দুদক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তাকেই আবার পিডিবিএফের অতিরিক্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে সংস্থাটির এক সম্মেলনে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব কামাল উদ্দিন তালুকদার বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, তদন্ত প্রতিবেদনে যতটুকু অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি। তাই আমি বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’ কিন্তু সচিবের এই বক্তব্যে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না? এমতাবস্থায় সব দুর্নীতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধান করে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনকে সংস্থাটির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্রিয় করতে সরকারের আরও মনোযোগ প্রয়োজন।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত