নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় তিতাস গ্যাসের ফতুল্লা কার্যালয়ের চার কর্মকর্তা ও চার কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে মসজিদে বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা ঘটার অভিযোগে এ আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. মামুন। তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্যাস লাইনের লিকেজ খুঁজতে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে মসজিদের উত্তর পাশের পাইপে দুটি লিকেজ পাওয়া গেছে। তবে এ লিকেজ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা তিতাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এটি পানির পাইপও হতে পারে। খোঁড়াখুঁড়ি শেষ হোক। তারপর বিস্তারিত বলা যাবে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন ফতুল্লা জোনের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান রাব্বি, সহকারী প্রকৌশলী এসএম হাসান শাহরিয়ার ও সহকারী প্রকৌশলী মানিক মিয়া। বরখাস্ত হওয়া কর্মচারীরা হলেন সিনিয়র সুপারভাইজার মনিবুর রহমান চৌধুরী, সিনিয়র উন্নয়নকারী মো. আইউব আলী, সাহায্যকারী হানিফ মিয়া ও কর্মী ইসমাইল প্রধান।
বরখাস্তের আদেশে বলা হয়, ‘নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার খানপুর, তল্লা এলাকায় বায়তুস সালাত জামে মসজিদে গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টায় বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় ২৭ জন মুসল্লি মারা গেছেন এবং আরও ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া মসজিদের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যে কারণে তিতাসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্য হয়েছে। মসজিদের বিস্ফোরণজনিত ঘটনা ফতুল্লা জোনের আওতাধীন এলাকায় হয়েছে। এ দুর্ঘটনা ফতুল্লা জোনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে হওয়ায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কারণ দর্শানোর নোটিস প্রদান ও চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’
মসজিদের মাটি খুঁড়ে পাইপে দুটি লিকেজ : নারায়ণগঞ্জে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্যাস লাইনের লিকেজ খুঁজতে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে মসজিদের উত্তর পাশের পাইপে দুটি লিকেজ পাওয়া গেছে। গতকাল সকাল থেকে মসজিদের সম্মুখে, উত্তর ও পূর্ব পাশে চারটি স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। দুপুর ২টায় খোঁড়াখুঁড়ির একপর্যায়ে মসজিদের উত্তর পাশে কর্মরত শ্রমিকরা মাটির তিন স্তরের নিচে ৪ ফুট গভীরে তিন ইঞ্চি ব্যাসের পাইপে দুটি লিকেজ দেখতে পান।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার আবদুল ওয়াহাব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত শনিবার মসজিদ কমিটির সভাপতির সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এ ঘটনার তারা লিখিত কোনো অভিযোগ করেছিলেন কি না। তারা তা করেননি। তিনি নিজে গিয়ে তিতাসকে জানিয়েছেন কি না। তিনি বলেন, জানাননি। সাধারণ সম্পাদকের কাছে শুনেছি, উনি নাকি টেলিফোনে ইনফর্ম করেছেন। এখন সাধারণ সম্পাদক কোথায়? তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। এখন সাধারণ সম্পাদক যদি কোনো নাম্বার বা তিতাসের লোকের সন্ধান দেন বা মসজিদ কমিটি কোনো ইনফরমেশন দেন তাহলে আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হবো। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাচ্ছি, মসজিদ কমিটি লিকেজ সারানোর জন্য কাকে বলেছে। আমাকে ওই ব্যক্তির নাম দিন আমরা চরম প্রশাসনিক বব্যস্থা নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরেজমিন আমরা দেখতে চাই মসজিদের নিচে গ্যাসের লাইন আছে কি না। যদি থেকে থাকে তাহলে মসজিদ তার কতটুকু দূরে। সেখান থেকে গ্যাস বের হয়েছে কি না। মসজিদ তৈরির সময় আমাদের লাইনটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তৈরি করা হয়েছে কি না। এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যে লাইনে গ্যাস আছে সে লাইনের কন্ডিশন কতটুকু ভালো বা খারাপ সেটাও দেখার বিষয় আছে। ওই লাইনটা বেশ পুরনো লাইন, অন্তত ৩০ বছর। যেখান থেকে গ্যাস বের হচ্ছে সেই লাইনের ব্যতিরেকে অন্য জায়গায় যদি লাইন ভালো থাকে তাহলে আমরা সবাই বুঝতে পারব মসজিদ তৈরির সময় ফাউন্ডেশন করতে গিয়ে আমাদের পাইপ লাইন ড্যামেজ করে মসজিদ তৈরি করেছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের জানিয়েছে কি না। আর ড্যামেজটা কীভাবে হয়েছে তা চিহ্নিত করার জন্যই আজ আমরা মাটি কেটে সেটা সরেজমিন দেখতে চাচ্ছি।’
তিতাসের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘নকশা অনুযায়ী গ্যাস লাইন আছে কি না আমরা তা দেখছি। এখানে আশপাশে যে গ্যাস লাইনগুলো দেওয়া হয়েছে তা ১৫-২০ বছর আগে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের উত্তর পাশে আমরা বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করব, ফাইলগুলো আমরা দেখব। কানেকশনগুলো কীভাবে হয়েছে তাও দেখব। আমরা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি মসজিদটি ইউনিয়ন পরিষদের জায়গায় এবং সড়কটি সিটি করপোরেশনের জায়গায়। এখানে সীমানায় সমস্যা আছে। আগে আমাদের লাইন হয়েছে পরে মসজিদ। সবাই জানেন, মসজিদের পেছনের অংশ প্রথমে হয়েছে এবং সামনের অংশ পরে। আমরা যে মাটিটা কেটেছি, তার দুটি লেয়ার বের করেছি এখন আমরা এন্টিলেয়ার পেয়েছি। তারপর আরেকটা এন্টিলেয়ার আমরা পেয়েছি। সে ক্ষেত্রে আমরা পুরোটা খুঁড়ে দেখি তারপর নির্দিষ্ট করতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘নকশার ওপরে মসজিদ বা স্থাপনা হলে তার দায়িত্ব তিতাস নেবে। তিতাসের ডিস্ট্রিবিউশন অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে স্থানীয়রা তিতাসকে এ বিষয়ে ইনফর্ম করে। এ ধরনের কোনো ইনফরমেশন আমাদের তিতাস অফিসে নেই।’
