সিনহা ‘হত্যার’ তদন্ত প্রতিবেদন জমা

বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:২৫ এএম

কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের হাতে ওই প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ৮০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে ৫৮৬ পৃষ্ঠার সংযুক্তিও জমা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রতিবেদনে  ১৩টি সুপারিশ করেছে কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়বন্তু নিয়ে কোনো তথ্য জানাননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা কমিটিপ্রধান। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে যেখানে যেটা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন তারা।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিটির প্রধানের সঙ্গে ছিলেন কমিটির সদস্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিনিধি লে. কর্নেল এস এম সাজ্জাদ হোসেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক জাকির হোসেন খান।

গত ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা। ওই ঘটনায় পুলিশের ভাষ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ২ আগস্ট তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরদিন কমিটি পুনর্গঠন করে চার সদস্যের করা হয়। সাত কর্মদিবস অর্থাৎ ১০ আগস্টের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বেঁধে দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর প্রথমবার কমিটির কাজের সময় বাড়ানো হয় ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। পরে কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় ফের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ সময়ের মধ্যে ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বক্তব্য গ্রহণ করতে না পারায় কমিটির মেয়াদ সর্বশেষ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর কমিটি কক্সবাজার জেলা কারাগারের ফটকে প্রদীপ কুমার দাশের বক্তব্য নেয়।

জানা গেছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মোট ১৩টি সুপারিশ রয়েছে। মূল প্রতিবেদনটি ৮০ পৃষ্ঠার। তবে এর সঙ্গে ৫৮৬ পৃষ্ঠার সংযুক্তি রয়েছে। এতে সিনহা নিহতের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা কমিটিপ্রধান। প্রতিবেদন গ্রহণ করে ঘটনার পরম্পরা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনা সরেজমিন তদন্ত করে কারণ, উৎস এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয়সহ সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটিকে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে এসেছে। রিপোর্টে কী আছে আমরা এখনো দেখিনি। আমাদের সচিব মহোদয় এগুলো বিশ্লেষণ করে যেখানে যেটা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী কাজ করবেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয় জানেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এটার পুলিশি তদন্ত চলছে। সে কারণে আমরা প্রকাশ্যে কিছু জানাতে পারব না। আমরা আদালতকে এই সম্পর্কে জানিয়ে দেব, আদালত মনে করলে এটাকে আমাদের কাছ থেকে অফিশিয়ালি নিয়ে যাবে। আদালত তদন্তের জন্য হয়তো এটা নিয়েও নিতে পারে। এটা আদালতের এখতিয়ার।’ তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নামে অভিযোগ আসবে তাদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে বলেও আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী।

সিনহা ‘হত্যার’ ঘটানাটি পরিকল্পিত ছিল কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট আমার কাছে মাত্র এলো। এর ভেতর কী লেখা আছে, কী উল্লেখ আছে আমরা তো জানি না কিছু। আমরা বের করে নেই, আমরা এগুলো স্টাডি করি, তারপরে আপনাদের জানাতে পারব।’

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সুপারিশগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো এখনো দেখিনি।’ এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে সেজন্য কী উদ্যোগ নিয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দেখুন, দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। আমরা মনে করি এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটুক। কেন ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে এগুলোর পুরোপুরি বিশ্লেষণ এখানে (প্রতিবেদনে) রয়েছে, সেগুলো আমাদের স্টাডি করতে হবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী কাজ করছে, সবাই সজাগ রয়েছে, আমরা মনে করি এ ধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে আমরা সবাই সজাগ রয়েছি।’

সিনহা ‘হত্যাকে’ কেন্দ্র করে দুই বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে একজন সাংবাদিকের এমন কথায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুই বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে এদেরকে অসন্তুষ্ট করবে এ ধরনের উপাদান আমরা পাইনি। আমরা মনে করি, চমৎকার একটি পরিবেশ রয়েছে, আমরা দেখেছি, পুলিশপ্রধান ও সেনাবাহিনীপ্রধান দুজনে মিলে কক্সবাজারে গিয়েছেন, তারা ব্রিফ করেছেন। কাজেই দুই বাহিনীর ভেতরে মতপার্থক্য রয়েছে, এগুলো সত্য নয়। চমৎকার পরিবেশ রয়েছে, দুই বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে।’

পুলিশের ভূমিকা মøান হবে না বলে মন্তব্য তদন্ত কমিটি প্রধানের : সিনহা ‘হত্যাকাণ্ডের’ ঘটনা পুলিশের ভূমিকাকে মøান করবে না বলে মন্তব্য করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চারজন কমিটির সদস্য এখানে উপস্থিত হয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে যে কাজটি করেছি, যে রিপোর্ট প্রণয়ন করেছি, সেটি হস্তান্তর করতে পেরেছি। আমাদের প্রথমে সাত কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল। ১ আগস্ট আদেশটি হয় সেদিন ছিল ঈদের দিন। আমি আমার মাকে দেখার জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কমিশনার স্যার আমাকে বললেন, তোমাকে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আমি ২ তারিখ হোয়াটস অ্যাপে (কমিটি গঠনের অর্ডার) পাই। ৩ তারিখ (আগস্ট) আমরা নমিনেশনের জন্য চিঠি লিখি, ৩ তারিখই সশস্ত্র বহিনী বিভাগ ও পুলিশ থেকে আমাদের দুজন সহকর্মীর নাম আমাদের দেওয়া হয়। ৪ তারিখে (আগস্ট) কক্সবাজারে গিয়ে প্রথম সভা করি। একটা কর্মপরিকল্পনা করি, আমি সংযুক্তিতে দিয়েছি ৩ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত কী কী করেছি তার বিস্তারিত ক্যালেন্ডারের মতো করেছিলাম, সেটি সংযুক্তিতে আছে।’

কমিটির প্রধান আরও বলেন, ‘আমি একটি কথা বলব, আমাদের পুলিশ বাহিনী যে আইনশৃঙ্খলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে, এই ঘটনাটি (সিনহা ‘হত্যা’) কোনোভাবেই তাদের ভূমিকাকে মøান করবে না। আমরা দেখেছি, তারা পরিশ্রম করে। আমরা চেয়েছি, আমাদের মন্ত্রণালয় যেটি নির্দেশনা দিয়েছে, এটির উৎস কী, কারণ কী, এই ধরনের ঘটনার প্রতিকারের ব্যাপারে কী ধরনের সুপারিশ করা যায়, সেই ব্যাপারে আমরা চারজন মিলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে কমিটির প্রধান বলেন, ‘স্যার আপনার সদয় অবগতির জন্য বলব, কর্মপরিকল্পনায় নির্ধারণ করেছি কারা কারা এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ রকম একটা সম্ভাব্য তালিকা করেছি। এটি ইনক্রিমেন্টাল ছিল, শেষ পর্যন্ত ৬৮ জনে এটি দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছি। এ ছাড়া ঘটনাস্থলগুলোতে রাত ৯টার দিকেও গিয়েছি। সাংবাদিক বন্ধুরা আমাদের সব সময় পাহারা দিয়েছেন, কিন্তু ওনারা আমাদের ধরতে পারেননি। আমরা রাতে এপিবিএনের (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) ফোর্স নিয়ে ডেমো করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি। যে পাহাড়ে মেজর সিনহা গিয়েছেন সেই পাহাড়ে গিয়েছি। ওখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে উৎস, কারণ ও আমাদের সুপারিশ প্রণয়ন করেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত