মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:২৭ এএম

‘আমার আগেই ছেলের মৃত্যু হলো! আমি এখন এই লাশ বইব?’ গগনবিদারী আর্তনাদ ও বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধ আলাউদ্দিন শেখ। গতকাল সোমবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের বেইজমেন্টে সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো সন্তান ইমরানের নিথর দেহের সামনে তাকে আহাজারি করতে দেখা যায়। কখনো মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন, পরক্ষণেই হাঁটু মুড়ে বসে  দুই হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছিলেন, কেন তার আগে তার সন্তানের মৃত্যু হলো। কেন সুস্থ করে তোলার ফরিয়াদ মঞ্জুর হলো না।

ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানান, নারায়ণগঞ্জ পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদের বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ ৩৭ মুসল্লির মধ্যে ২৭তম মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হয় ইমরানের নাম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ২৭ জনের মৃত্যু হলো। ইতিমধ্যে মামুন নামে একজনকে সুস্থ হিসেবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ৯ জন এখনো চিকিৎসাধীন, যারা সবাই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন।

ইমরানের একাধিক স্বজন জানান, ইমরান তল্লা মসজিদের পাশেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকতেন। পেশায় পোশাক কারখানার শ্রমিক ইমরানের আয়ের একটি অংশ গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়াতে বাবা-মার কাছে পাঠাতেন। বাকি টাকায় নিজ সংসার চালাতেন। নিয়মিত নামাজ পড়তেন। পরিবারসহ সবার কাছে একজন প্রিয় ও ভালো মানুষ হিসেবে সুনাম ছিল। ইমরানের মামি ফারজানা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে  বলেন, গত শুক্রবার বাড়ি থেকে তল্লার বাসায় ফিরেছিল। তারপর নামাজ পড়তে গিয়েই দগ্ধ হয়। পোশাক কারখানায় চাকরি করে নিজের পরিবার ও গ্রামে থাকা বাবা-মার জন্যও জন্যও টাকা পাঠাত। এখন ছেলেটির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের সদস্যরাই  নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বয়োবৃদ্ধ আলাউদ্দিন বলেন, ‘মসজিদের আগুনে পুড়ে এখানে ভর্তির পর থেকেই ওকে (ছেলে) বাঁচানোর আর্জি জানিয়ে আসছি  আল্লাহর কাছে। তিন রাত না ঘুমিয়ে প্রাণ বাঁচানোর ফরিয়াদ জানিয়েছি। কিন্তু একি শুনলাম। মানুষ তো আমাকে পাগল বলবে, আমার আগেই কেন ছেলের মৃত্যু হলো। এই কষ্ট আমি কাকে বুঝাব, তার জন্য অপেক্ষা করেও বাঁচাতে পারলাম না।’ এ সময় তার আহাজারির দৃশ্য সইতে না পেরে উপস্থিত অনেককেই চোখ মুছতে দেখা গেছে। ইমরানের অন্য স্বজনরাও আহাজারি করতে থাকেন।

স্বজনরা জানান, ইমরানের স্ত্রীর নাম মুক্তা ও তাদের ৮ বছর বয়সী ছেলের নাম ইব্রাহিম। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই শিশুসন্তান নিয়ে স্বামীর সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন মুক্তা। হাসপাতালে থাকতে থাকতে শিশুসন্তানটি প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় সকালের দিকে তাদের নারায়ণগঞ্জের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই এলো এই মৃত্যুর খবর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুক্রবারের পর থেকে একাধিক মৃত্যুর খবরে হাসপাতালের সবখানেই আহাজারির দৃশ্য দেখা গেলেও গতকাল ছিল সেই তুলনায় অনেক কম। গতকাল সোমবার সারা দিনে কেবল ইমরানের মৃত্যুর তথ্য আসে। তবে এই একটি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চিকিৎসাধীন দগ্ধ রোগীর স্বজনদের মনে আবারও অজানা আতঙ্ক ভর করতে থাকে। 

চিকিৎসাধীন দগ্ধ সিফাতের বাবা মো. স্বপন  জানান, ছেলের সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় হাসপাতালে  অপেক্ষা করছি। আজও ছেলের সঙ্গে দেখা করেছি। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে ও ইশারা দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গার যন্ত্রণার বিষয়টি বলার চেষ্টা করেছে। তার শরীরের ২২ ভাগ পুড়লেও যেখানেই হাত দিয়েছি, সেখানেই ব্যথার কথা বলেছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে গলা, বুক ও হাতে। যেখানে হাত দিই, সেখানেই ব্যথার কথা জানানোর চেষ্টা করেছে। আমি আর সহ্য করতে পারিনি। তিনি আরও জানান, তল্লা মডেল স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে এইচএসসিতে ভর্তির অপেক্ষায় ছিল। তার চিন্তায় তার মা মঞ্জু বেগম অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী।

চিকিৎসাধীন শেখ ফরিদ (২২) নারায়ণগঞ্জের ডিসি অফিসে চাকরি করতেন। তার চাচাত ভাই জহিরুল ইসলাম জানান, ছেলের জন্য তার কৃষক বাবা ইমদাদুল হক গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ থেকে এখানে অবস্থান করছেন। তার জন্য সবসময় নামাজ পড়ে দোয়া করছেন। এখন কী হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তার সঙ্গে দেখা হলে  ইশারায় অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি।  চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শেখ ফরিদের ২২ ভাগ পুড়েছে। বাকিদের অবস্থা আরও শোচনীয়। যাদের প্রত্যেকের প্রায় ৮০ ভাগ থেকে ৯০ ভাগ পর্যন্ত পুড়েছে। একই ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন চিকিৎসাধীন পোশাক শ্রমিক কেনানের (২৪) স্বজনরা। তার ৯০ ভাগ পুড়েছে। চিকিৎসাধীন আইসিইউতে। কেনানের বাবা চুন্নু মিয়া জানান, কেনানের দুই বছরের ছেলে রাফিকে নিয়ে তার স্ত্রী বাসায় অপেক্ষা করছে। তাকে বলা হয়েছে, কেনান সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরবে।

ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল জানান, চিকিৎসাধীন ৯ জনের মধ্যে ৪ জন আইসিইউতে, ৫ জনকে পোস্ট ওপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। ১০ ভাগ পোড়া নিয়ে ভর্তি হওয়া মামুন নামে সুস্থ হয়ে ওঠা একমাত্র রোগীকে বিকেল পৌনে তিনটার দিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। মামুনের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপায়। গতকালই তিনি বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন বলে তার স্ত্রী রুমি বেগম জানিয়েছেন।

বদ্ধ মসজিদে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস এত মৃত্যুর কারণ : নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুনের ঘটনায় প্রচুর পরিমাণে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস তৈরি হয়েছিল। বিস্ফোরণের পরপরই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ মসজিদটির মুসল্লিরা অক্সিজেনের বদলে এই ধরনের বিষাক্ত  গ্যাস গ্রহণ করেন। এছাড়া আগুনে তাদের অধিকাংশের শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যায়। একই সঙ্গে আগুনে দগ্ধ প্রত্যেক মুসল্লির শ্বাসনালি পুড়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব কারণে চিকিৎসাধীন এই দগ্ধ মুসল্লিদের বাঁচানো যাচ্ছে না। গতকাল সোমবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের একাধিক বিশেষজ্ঞ এসব কথা বলেছেন।

তারা জানান, আগুনে কারও শরীরের ৫০ ভাগ পুড়ে গেলে সেটাকে ‘মেজর বার্ন’ হিসেবে বিবেচনা করে সেই মোতাবেক চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। এসব ক্ষেত্রে রোগীর শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচানো সম্ভব হয়। তবে নারায়ণগঞ্জের মসজিদের বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুনে দগ্ধ অধিকাংশ রোগীর ৮২ থেকে ১০০ ভাগ পুড়ে গেছে। তাছাড়া প্রত্যেকের শ্বাসনালিও পুড়েছে।

গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদের এশার নামাজ চলাকালীন বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মসজিদে নামাজ আদায়কালে প্রায় অর্ধশত মুসল্লি আহত হন। এদের মধ্যে দগ্ধ ৩৭ জনকে রাতেই রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এদিন রাত সোয়া ১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জুবায়ের নামে সাত বছর বয়সী এক শিশুর প্রথম মৃত্যু হয়। পরদিন শনিবার একদিনেই একে একে ২১ জন মুসল্লির মৃত্যু ঘটে। রবিবার  আরও ৫ জন মুসল্লির মৃত্যুর তথ্য জানান চিকিৎসকরা। সর্বশেষ গতকাল সোমবার ইমরান নামে আরও একজন মুসল্লিকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। এ নিয়ে চিকিৎসাধীন ৩৭ জন দগ্ধ মুসল্লির মধ্য থেকে ২৭ জনেরই মৃত্যু ঘটল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত