সাদা বলে ইংল্যান্ডের ‘সর্বকালের সেরা’ বাটলার

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৫৫ এএম

ইংলিশ ক্রিকেটে সুপার স্টারের অভাব নেই। ডব্লিউ জি গ্রেস থেকে শুরু করলে গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন যদি হয়, ইংল্যান্ডের প্রথম গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি সুপারস্টার কে? একটাই নাম পাবেন জস বাটলার। একুশ শতকের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তার প্রভাব অসাধারণ।

এর মানে এই নয় যে টেস্টে বাটলার ভালো নন। গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাউদাম্পটন টেস্টে তার ১৫২ রানের ইনিংস কিন্তু অন্য কথা বলে। ৪৭ টেস্টে বাটলারের গড় (৩৯.৯০) ওয়ানডের চেয়ে (৪০.৮৮) হয়তো খারাপ। আর টি-টোয়েন্টিতে লোকে এখন গড় দেখে না। দেখে স্ট্রাইক রেট। তারপরও ৭১ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২৮.৫২ গড়ে ১৪৫৫ রান আছে বাটলারের। স্ট্রাইক রেট ১৪০.১৭। উল্লিখিত পরিসংখ্যান থেকে এটাই প্রমাণ হয় টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে বাটলার মোটেও খারাপ নন, কিন্তু সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বেশি ভালো হওয়ায় সামান্য নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৮ মাসের মধ্যে তিনটি দ্রুততম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছিলেন বাটলার। একটা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লর্ডসে। অন্যটা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এজবাস্টনে। শেষটা পাকিস্তানের বিপক্ষে দুবাইয়ে। তিনটি ইনিংসই ইংল্যান্ডের দ্রুততম সেঞ্চুরির তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। লঙ্কার বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরির পরেই ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে ডাক পান বাটলার। অভিষেকে ভারতের বিপক্ষে সাউদাম্পটনে খেলেছিলেন ৮৫ রানের ইনিংস। প্রথম আট টেস্টে বাটলার করেন ৮৫, ৭০, ৪৫, ০, ৫৯*, ১৩, ৩*, ৩৫*, ৬৭, ১৪, ১০ ও ৭৩। এটাই সব ফরম্যাটে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তাকে।

বাটলারের গল্প শুরু হয়েছিল টনটনে। নব্বইয়ের ৮ সেপ্টেম্বর সমারসেটের ওই শহরে তার জন্ম। নিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে ৯ বছরের শিশু ছিলেন বাটলার। টনটনের ম্যাচ দেখতে হাজির হয়েছিলেন। সৌরভ গাঙ্গুলি আর রাহুল দ্রাবিড়ের জোড়া সেঞ্চুরি শিশুমনে রেখাপাত করেছিল। ফলে ১২ বছর বয়সে ভর্তি হন সমারসেট অ্যাকাডেমিতে। ঘরোয়া সীমিত ওভারে নিজের জাত চেনাতে বেশি সময় লাগেনি বাটলারের। সিবি-৪০ টুর্নামেন্টে ৫৫ গড়ে ৪৪০ রান করার পর প্রথম শ্রেণিতে অভিষেক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখেন ২০১১তে। টি-টোয়েন্টি অভিষেকে ছাপ ফেলতে পারেননি। প্রথম চার ম্যাচের তিনটিতে ব্যাটই করতে পারেননি। প্রথম হাফসেঞ্চুরি পেতে দেড় বছর লেগেছিল। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে রান পাচ্ছিলেন বাটলার। হয়তো সে কারণেই তখনকার ইংলিশ কোচ অ্যাশলে জাইলস ওয়ানডে দলে ডেকে নেন তাকে। ক্রেগ ক্রিসওয়েটার তখন ইংল্যান্ড দলের উইকেটকিপার। ওপেনিংয়ে ব্যাট করতেন। কোচ বাটলারকে শুধু দলে নিয়েই খুশি থাকেননি ক্রিসওয়েটারের বদলে উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্বও দেন। আস্থার প্রতিদান দিতে ১৫ ম্যাচ খেলতে হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে বাটলার করেন ৭৫। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই সিরিজে যথাক্রমে তার রান ছিল ৭৫, ৬৫*, ৪২, ৩৪*, ৪৯, ৪, ৭২।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠা পেতে কিছুটা সময় নিলেও বাটলার উন্নতি করেছেন দ্রুত। বিশ্বকাপের আগে এক সাক্ষাৎকারে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিকি পন্টিং বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর ক্রিকেটার হতে চলেছে বাটলার। শেষ দণন-তিন বছরে ওর মতো উন্নতি করতে কম ক্রিকেটারকেই দেখেছি। আইপিএলে ওকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ এসেছিল। তখনো আমি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তারপর থেকে দেখছি কেবল টি-টোয়েন্টি নয়, সব ধরনের ক্রিকেটেই উন্নতি করেছে বাটলার। সব ক্ষেত্রেই সাবলীল। মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে আমার চোখে ও বিশ্বের অন্যতম সেরা। যেকোনো দিকে শট নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। মারে জোরও প্রচণ্ড। বড় শট নিতে ভয় পায় না।’

বাংলাদেশের বিপক্ষে কার্ডিফে ৪৪ বলে ৬৫ রানের ইনিংস দিয়ে ২০১৯ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করলেও পরের ম্যাচগুলোতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বাটলার। লর্ডসের মহানাটকীয় ফাইনালে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। প্রচ- চাপের মুখে ৫৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন বাটলার। সুপার ওভারের শেষ বলে মার্টিন গাপটিলকে রান আউট করেন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপসহ আমি আটটি ফাইনাল খেলেছি। যার মধ্যে সাতটিতেই হেরেছিলাম। সমারসেটের হয়ে বেশ কয়েকটা ফাইনাল খেলেছি। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির (২০১৩) ফাইনাল খেলেছি, ইডেনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালেও দলে ছিলাম। তাই জানি, অন্য দলকে ট্রফি তুলতে দেখাটা কত যন্ত্রণার। সেই যন্ত্রণা আর পেতে চাইনি।’

বিশ্বকাপের পর করোনা অতিমারীর বিপন্নতা কাটিয়ে আবার মাঠে ফিরেছে ক্রিকেট। বাটলার আগের মতোই ব্যাটিংয়ে আলো ছড়াচ্ছেন। ৩০তম জন্মদিনের দু’দিন আগে ওপেন করতে নেমে ৫৪ বলে ৭৭ রানের ইনিংস খেলে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বাটলার অস্ট্রেলিয়াকে।

টি-টোয়েন্টিতে বরাবরই সেরাদের একজন বাটলার এখন আরও কার্যকর হয়ে উঠেছেন ওপেনিংয়ে উঠে আসার পর। ২০ ওভারের ক্রিকেটে ইনিংস শুরু করতে নেমে তার গড় ৫১, স্ট্রাইক রেট ১৫৭! অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর বাটলার নিজেও জানালেন, এই পজিশনই তার বেশি পছন্দ। ‘টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটিই সম্ভবত আমার প্রিয় পজিশন। এখানে বেশ সাফল্য পেয়েছি আমি। আর সত্যি বলতে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শীর্ষ তিন পজিশনই যে কারও জন্য ব্যাটিংয়ের সেরা জায়গা। প্রথম তিন পজিশনে ব্যাট করার সুযোগ পেলে লুফে নেওয়ার মতো আমাদের মনে হয় অন্তত ৮-৯ জন ব্যাটসম্যান আছে।’

বাটলারের রবিবারের ইনিংস দেখে ইংল্যান্ডের সাবেক ব্যাটসম্যান ও এক সময়ের সীমিত ওভারের স্পেশালিস্ট নিল ফেয়ারব্রাদার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তার। ‘জস বাটলারের আরেকটি মাস্টার ক্লাস! ইনিংসটির গতি, ছন্দ দারুণ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দলকে জয়ের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া... একজন ব্যাটসম্যান তার কাজ করে যাচ্ছে দারুণ স্কিল ও বুদ্ধিমত্তায়... অসাধারণ...!!!’ ফেয়ারব্রাদারের সেই টুইট শেয়ার দিয়েই সম্প্রতি ৫০০ টেস্ট উইকেট স্পর্শ করা স্টুয়ার্ট ব্রড লিখেছেন, ‘ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা সাদা বলের ক্রিকেটার তার কাজ করেছে আবারও।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত