বদলি হয়ে এক জেলায় সবে গিয়েছি, এক দিন এক দায়রা মামলায় দেখি চার্জ শুনানির জন্য তা বছর দেড়েক ধরে ঘুরছে। সব দেশেই মামলা বিচারের কিছু ধাপ থাকে, আমাদেরও আছে। ফৌজদারি মামলার ধাপগুলো ফৌজদারি কার্যবিধিতে নির্দিষ্ট। বিচার শুরু হয় চার্জ (অভিযোগ) গঠন দিয়ে। আসামির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে তার সারবত্তা দেখে। দু’পক্ষকে শুনে নথিপত্র ঘেঁটে বিচারক যদি দেখেন রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ যা এনেছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা খণ্ডাতে না পারলে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় তাহলে চার্জ গঠন করবেন। খুঁত দেখলে ধরিয়ে দিয়ে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেবেন, না হলে আসামির ডিসচার্জে মামলা এখানেই শেষ। চার্জ গঠন (কবে, কখন, কোথায়, কীভাবে, কোন অপকর্ম করেছে এবং তার দ্বারা কোন অপরাধ হয়েছে তার উল্লেখ) হলে আসামিকে (যদি পলাতক না হয়) পড়ে শোনাতে হয়। দোষ স্বীকার করলে (খুবই বিরল) মামলা এখানেই শেষ সমুচিত সাজা দিয়ে। নির্দোষ দাবি করলে (এটিই সাধারণ) বা পলাতক থাকলে শুরু হবে সাক্ষী ডেকে বিচার। [ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৪১-২৪৪ ম্যাজিস্ট্রেটের, ২৬৫বি-২৬৫এফ দায়রা জজের জন্য]
দেখলাম সেটি ‘মার্ডার কেইস’। আসামিপক্ষে ‘ডিসচার্জের’ (অব্যাহতির) দরখাস্ত দেওয়া, শুনানির জন্যই ঘুরছে। ডিসচার্জযোগ্য মামলা কমই থাকে। তার চেয়েও কম আগ্রহ থাকে বিচারক ও আইনজীবীর, বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া। শুরুতেই মামলা শেষ হলে আইনজীবী লোকসান ভাবেন। শুনানি, নথিপত্র ঘাঁটা, আদেশ লেখা, প্রায় রায়ের খাটুনি। হাইকোর্টে স্টেটমেন্ট পাঠাবার ছকে নিষ্পত্তির গণনায় সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষের খালাসটা আসে, ডিসচার্জটা আসে না। লাভ নেই বিচারকেরও। মেরিট দেখব শেষ বিচারে। সব মামলা সাক্ষীতে ওঠাই নিয়ম যেন। উল্টো ব্যতিক্রম ঘটে ডিসচারর্জযোগ্য নয় এমন দু’একটায় কিছু আবার ঝুলে থাকে। এই মামলায় আমার হাতে সে সময়ও অবশিষ্ট রাখেননি পূর্বসূরিরা।
শুনানি নিলাম, সিডি (তদন্তের কেইস ডকেট), নথিপত্র দেখলাম। এক সকালে স্থানীয় এক বিলে জিউলি (জিকা) গাছের ডালে কাঁচা পাটের রশিতে লাশ ঝুলতে দেখা যায়। লাশটি সালামের, আত্মহত্যা করেছে বলে চৌকিদারের লিখিত পেয়ে থানায় সালামের ‘ইউডি’ (Unnatural Death) মামলা রেকর্ড হয়। তদন্তকারী এসআই সেদিনই লাশটা নামিয়ে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করেন। ‘লাশের মাথা ডানদিকে কাত, গলার বাম পাশে ও পেছনে ফাঁসের দাগ, জিহ্বা দাঁতে কামড়ানো, বাম হাতের কনুইয়ের নিচে সামান্য ফোলা, দু’পা সোজা, পাতা দু’টো নিচের দিকে’ দেখেছেন বলে সুরতহাল রিপোর্ট লেখেন। তাতে লেখেন, সালাম মানসিক রোগী ছিল, সে আত্মহত্যা করেছে বলে আত্মীয়-স্বজনসহ স্থানীয় লোকজন জানায়। সালামের লাশ হিসেবে চালান করে মর্গে (লাশকাটা ঘর) পাঠালেন ময়নাতদন্তে (আরবি ‘মুআয়নহ্’, ইংরেজিতে পোস্টমর্টেম)।
কিন্তু, ৫ দিন পর থানায় জ্যান্ত হাজির সেই সালাম সেই চৌকিদারসহ। লাশটি তবে সালামের নয়! ডায়েরিভুক্ত করে লাশের পরিচয় উদ্ধারে দেশের থানাগুলোতে বেতার-বার্তা পাঠালেন তদন্তকারী। এই ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ উঠল আরও ৫ দিন পরে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেয়ে, ‘In my opinion death was due to asphyxia resulting from strangulation which was ante-mortem and homicidal in nature.’ (গলাচাপায় শ্বাসরোধে মৃত্যু ঘটেছে যার ধরন হত্যার মতো) লেখা দেখে। আরও মাস দুয়েক তদন্ত চালিয়েও কূলকিনারা করতে না পেরে ‘অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছে’ বলে থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় এজাহার করে একই উদ্দেশে খুন ও আলামত গায়েবের এই মামলা লাগিয়ে ইউডি মামলার তদন্তকারী নিজে বাঁচলেন।
এবারে খুনের মামলার প্রথম তদন্তকারী এসআই একজনকে গ্রেপ্তার আর সাক্ষীদের জবানবন্দি (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায়) রেকর্ড করে দু’মাসে বদলি অন্যখানে। দ্বিতীয়জন সাড়ে চার মাসে কিছুই করতে পারেননি, অন্যখানে বদলি। তৃতীয়জন ছয় মাস তদন্ত চালিয়ে পেলেন, ‘মৃত ব্যক্তির নাম ঠিকানা পরিচয় পাওয়া না গেলেও প্রকাশ্য নিরপেক্ষ সাক্ষীরা বলে আ. সালামের মতো দেখতে লোকটিকে ৃ এলাকায় কিছু প্রতারকচক্রের লোকের সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে অনেক সাক্ষী দেখে। এলাকায় অপরাধ দমন সভা, সোর্স নিয়োগ, নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও যাচাই করিয়া উক্ত এলাকায়‘(নতুন পাঁচ আসামির নাম)-সহ আরও অজ্ঞাতনামা এক প্রতারকচক্র রহিয়াছে। তাহারা স্বর্ণমূর্তি দিবে বলিয়া প্রতারণা করিয়া নিরীহ লোকজন বিদেশ হইতে আনিয়া জঘন্য কার্যক্রম করে।’ তার তদন্তে ‘মৃত লোকটি প্রতারণার শিকার হইয়া আসামিদের (আগেরজনসহ তার ঐ পাঁচজনের নাম) হাতে নিহত হয় বলিয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।’ তারা পাঁচজনের মধ্যে তিনজনকে ‘সন্দিগ্ধ হিসাবে’ গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ‘তাহারা স্বীকার না করিলেও কথাবার্তা রহস্যজনক।’ তার তদন্তে ‘আসামি ছয়জন অত্র খুন মামলায় জড়িত বলিয়া প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে।’ ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘আলাপ আলোচনা করিয়া’, ‘তদন্ত দীর্ঘায়িত না করিয়া’ অনুমতি নিয়ে এই ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিলেন। লিখলেন, ‘যদি কোনো কালে মৃত ব্যক্তির নাম-ঠিকানা পাওয়া যায় আদালতকে অবহিত করা হইবে।’
লাশ পাওয়া থেকে ১৪ মাস পরে পাওয়া গেল এই। বাঁধিয়ে রাখার মতো একখানা চার্জশিট বটে! লাশের পরিচয়ই উদ্ধার হয়নি। ‘সালামের মতো দেখতে লোকটিকে’ আসামিদের সঙ্গে দেখা যায়নি, এলাকার কিছু প্রতারকচক্রের লোকের সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে দেখার ‘প্রকাশ্য নিরপেক্ষ’ সাক্ষীদের নাম-ধাম অপ্রকাশিত। আসামিরা স্বর্ণমূর্তি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে ‘জঘন্য কার্যক্রম’ করার সাক্ষী-প্রমাণ নেই। সে তথ্য সোর্সের দেওয়া, তার নাম বলা বারণ। চারজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে ‘সন্দিগ্ধ’ হিসেবে, জিজ্ঞাসাবাদও হয়েছে, কারও দোষ স্বীকারোক্তির জবানবন্দি আদায় হয়নি। নিঃসন্দেহ হয়েছেন ‘তাদের কথাবার্তা রহস্যজনক!’ কোনটা প্রাথমিক প্রমাণ! কল্পকাহিনী ফাঁদা সাক্ষ্য-প্রমাণহীন এটা কি চার্জশিট? এফআরটিও (প্রমাণ না পাওয়ার রিপোর্ট) তো এত নিখুঁত হয় না! ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ ছাড়লেন কীভাবে!
আমাদের বিচার তো এতটা যান্ত্রিক নয় যেখানে চার্জশিট নামের এমন একটা কাগজ ঢুকিয়ে দিলেই সাক্ষী-প্রমাণ গ্রহণের দীর্ঘপরিক্রমা ছাড়া নিস্তার নেই! মামলা দায়রায় পাঠাবার আগে ‘কগনিজ্যান্স’ (আমলে নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন) ম্যাজিস্ট্রেটকে চার্জশিট গ্রাহ্য করে আসামির অপরাধ আমলে নিতে হয়। [ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯০, ১৯৩, ২০৫সি] যে কাহিনী দিয়ে আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট হয়েছে তাতে অপরাধটি ঘটে থাকতে পারে এবং এই আসামিই তা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে নথিপত্রে দেখতে পেলেই তা গ্রাহ্য করে আমলে নিয়ে দায়রায় পাঠাবার কথা। খুঁত পেলে ধরিয়ে দিয়ে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেওয়ার কথা। [ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৭৩(৩বি)] না হলে আসামির অব্যাহতিতে মামলা হবে এখানেই শেষ। তেমনি, আসামি এই অপরাধ করেছে বলে মনে করার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ নথিপত্রে পেলেই বিচারে নেওয়ার কথা দায়রা জজের। না হলে অব্যাহতি বা অধিকতর তদন্তে দেওয়ার কথা তারও।
নি®প্রাণ যন্ত্রও তো এতটা অনুভূতিহীন হতো না। চার্জশিট নামের এই ‘অপদার্থ’ দিলে সেও ‘খটাংখটাস’ আওয়াজ করে থামিয়ে দিত। বিবেকবান বিচারকদের হাত দিয়ে পার হয়ে এলো! সাক্ষ্য কোথায় যা আসামি খণ্ডাবে! প্রমাণ কোথায় যার ওপর মামলা দাঁড়ায়! কোন বিবেচনায় এই চার্জশিট গ্রহণযোগ্য হলো? দায়রায় সোপর্দ হলো কী বিবেচনায়? দায়রা জজ বিচারে নিলেন কোন বিবেচনায়? কেবলই খুনের অভিযোগ বলে? ভিত্তি কোথায়? কগনিজ্যান্সেরই যোগ্য নয়। খুনের বিষয় বলে গুরুত্ব পেয়ে থাকলে তো তার বিচারের জন্য যথেষ্ট সাক্ষী-প্রমাণ সংগ্রহে কোনো একটা ধাপে অধিকতর তদন্তের আদেশ উচিত ছিল। তখন তবু কিছু পাওয়ার সময় ও আশা হয়তোবা ছিল। চার্জশিট নামের এই ‘অপদার্থটি’ বিবেচনাহীনভাবে গ্রহণ করা, আমলে নেওয়া, বিচারে পাঠানো-নেওয়ার মধ্যে প্রহসন অনুষ্ঠান ছাড়া বিচারের তো কিছু দেখি না। লাশ পাওয়ার তিন বছরেও পরিচয় মেলেনি। লাশ পাওয়ার পরদিন ময়নাতদন্তের কাটাছেঁড়া শেষে সালামের আত্মীয়রা নিয়ে গিয়ে কবর দিয়েছে। হাড়গোড় মিললেও ডিএনএ পরীক্ষা পদ্ধতি দেশে আসেনি তখনো। জব্দ আছে তার পরনের চেক ল্ুিঙ্গর একটুকু টুকরা আর সেই কাঁচা পাটের রশি, সেসব এতদিনে জীর্ণ-বিবর্ণ। দাবিদার কেউ হাজির হলেও শনাক্ত অসম্ভব। জট খোলার সূক্ষ্মতম সুতাও দেখা যাচ্ছে না। এখন অধিকতর তদন্ত মানে আরেক প্রহসন, নতুন কিছু লোকের হয়রানি, আর এই আসামিদের ‘বিষফোঁড়া’ বৃদ্ধি! এই প্রহসনের এখানেই যবনিকাপাত সমীচীন। আসামিদের ডিসচার্জ দিই। সালামের মতো দেখতে লোকটি আসলে হয়তো বেওয়ারিশ নন। দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু তাকে বেওয়ারিশ লাশ বানিয়েছে। তার কিনারা তো হলোই না; মাঝখানে ‘সালামের মতো দেখতে’ লাগিয়ে প্রহসন অনুষ্ঠানে কিছু লোকের হয়রানি আর কিছু টাকা এ-পকেট ও-পকেট হয়ে গেল!
লেখক আইনগ্রন্থকার, সাবেক সিনিয়র জেলা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক
