চলমান শ্রমিক আন্দোলন ও বিভিন্ন চাপে সংকট নিরসনের বিষয়ে নমনীয় ড্রাগন সোয়েটার মালিকপক্ষ। শ্রম আইন মেনে শ্রমিকের সব পাওনা পরিশোধে সম্মত তারা। এমনকি শূন্য পদগুলোতে আন্দোলনরতদের যোগদানের সুযোগ এবং শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকেও রাজি মালিকপক্ষ। তবে ওই বৈঠকে মালিক সংগঠন, শ্রমিক এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) প্রতিনিধি থাকতে হবে। বাইরের কেউ থাকতে পারবে না।
এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ড্রাগন সোয়েটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার শ্রমিকরা ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদে পা দিয়েছে। আমি জুন পর্যন্ত বসিয়ে রেখে তাদের বেতন দিলাম। গত ৩ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে তাদের কাজে ফেরা ও পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলাম। বৈঠকে তারা সব মেনে নিল। এরপর কারখানায় না এসে তারা ঝাড়ু মিছিল করল। বিদেশে আমার বিরুদ্ধে একদল এজেন্টদের দিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালাল। এতে দেশ ও আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এখন তাদের সঙ্গে বৈঠকের আর কী আছে? তারপরও আমি বলছি শ্রমিকরা আমার ভাই-বোন। বেশকিছু পদ এখনো ফাঁকা, তারা চাইলে যোগদান করতে পারে। আর তা না চাইলে আমি শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের পাওনা বুঝিয়ে দেব। সেক্ষেত্রে আপনি (এই প্রতিবেদক) এবং অন্য গণমাধ্যমকর্মীরা মধ্যস্থতা করতে পারেন। কিন্তু যেসব ট্রেড ইউনিয়নের নেতা এখানে খবরদারি করছেন, তাদের ইউনিয়ন আমাদের কোম্পানিতে রেজিস্টার্ড না। তাহলে তারা কার্যক্রম চালায় কীভাবে? তারা কেউ থাকতে পারবে না।’
ড্রাগন সোয়েটারের এমডির প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কারখানার শ্রমিক প্রতিনিধি আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘করোনাকালে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনের মুখে পরে বিজ্ঞপ্তি দেয়। কারখানা চালু করে আমাদের পরিবর্তে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। আমাদের জানানো হয় কারখানা কুমিল্লায় স্থানান্তরিত হবে। স্টাফদের টাকা দেবে কিন্তু শ্রমিকদের দেবে না। উনি (মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস) ২০ বছরে এমন অনেক বসেছেন; কখনো আন্তরিকতার সঙ্গে সমাধান করেননি। আমরা ওনার ওপর ভরসা পাচ্ছি না। বরং ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা সব সময় আমাদের পাশে ছিলেন।’
পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠান ড্রাগন সোয়েটারের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। করোনাকালে কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও গত ১৬ এপ্রিল থেকে পুনরায় চালু হয়। কিন্তু আন্দোলনরত অন্তত ৩৫০ শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। মালিকপক্ষ তাদের জুন পর্যন্ত বেতন এবং বকেয়াও পরিশোধ করে। কিন্তু শ্রমিকরা লাগাতার আন্দোলন করতে থাকেন।
বিষয়টি সমাধানে গত ৩ সেপ্টেম্বর ডিআইএফই প্রতিনিধি, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জলিল তালুকদার, বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, শ্রমিক প্রতিনিধি ও ড্রাগন সোয়েটারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ৫ সেপ্টেম্বর শ্রমিকরা কারখানা থেকে শ্রম আইন অনুযায়ী যার যা প্রাপ্য, তা বুঝে নেবেন। আর যেসব শ্রমিক কাজ করতে চান, তারা পুনরায় কাজে যোগ দেবেন।
মালিকপক্ষ ও বিকেএমইএর দাবি, ওইদিন কেউ কারখানায় যাননি। পরের দিন ৬ সেপ্টেম্বর তারা গোলাম কুদ্দুসের বাসার সামনে ঝাড়ু মিছিলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রেস ক্লাব থেকে গুলশানের উদ্দেশে যাত্রা করে। পুলিশের বাধায় শ্রমিকরা শ্রম ভবনের সামনে অবস্থান নেন। গত মঙ্গলবার আবারও তারা মিছিলের জন্য গুলশানের একটি ব্রিজের নিচে ঝাড়ু জড়ো করলে পুলিশ তা উদ্ধার করে।
ড্রাগন কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্দোলনরতদের একটি অংশ কারখানার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত। তাদের বিরুদ্ধে কারখানাবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে গত বছর তারা কারখানায় আসা বন্ধ করে দেন। আইন অনুযায়ী সময়ক্ষেপণ করে মালিকপক্ষ ওইসব পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। তাদের সঙ্গে যোগসাজশে শ্রমিকরাও ধীরে ধীরে কারখানায় আসা বন্ধ করে দেন। এরপর গত ১৫ জুন আন্দোলনরত শ্রমিকদের নিয়ে মালিকপক্ষ একটি বৈঠক করে। ওই বৈঠকে শ্রমিকরা নিয়মিত কাজে ফেরার প্রতিশ্রুতি লিপিতে স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে কারখানার পক্ষ থেকে তাদের সতর্কীকরণ চিঠি দেওয়া হয়। ড্রাগনের মালিক কুদ্দুস নিজেই সেই চিঠি বিলি করেন। এরপরও তারা কারখানায় না ফিরে আন্দোলন চালিয়ে যায়। জুলাই থেকে ওইসব শ্রমিকের বেতন বকেয়া আছে। তবে তাদের নিরাপত্তা তহবিলে জমাকৃত টাকা পাওনা রয়েছে। ড্রাগন কর্র্তৃপক্ষ এই টাকা দিতে প্রস্তুত আছে।
সিদ্ধান্তের পরও কারখানায় না গিয়ে ঝাড়ু মিছিলের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, ‘আমাদের কতিপয় শ্রমিক গিয়েছিল। কিন্তু তারা যোগ দিতে পারেনি। আন্দোলনের কর্মসূচি আমরা নিই না। এটা ট্রেড ইউনিয়ন নেয়। তারা যেটা আমাদের জন্য ভালো মনে করেছে, তাই করেছে। ব্যাখ্যাও তারা দিতে পারবে।’ তবে কারখানায় যাওয়া ও কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি অস্বীকার করেন গোলাম কুদ্দুস।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জলিল তালুকদারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। খুদেবার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
এদিকে গত বুধবার সরকারের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির এক বৈঠকে গোলাম কুদ্দুসের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি যাননি। শ্রমিকদের অভিযোগ, গোলাম কুদ্দুস এই সমস্যার সমাধান চাইলে অবশ্যই বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন।
শ্রমিকরা সমস্যা সমধানে পোশাক মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে চিঠি দিলে সংগঠন দুটি বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে মনোনীত করে। হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাসের পর মাস শ্রমিকরা অনুপস্থিত থাকার পরও তাদের বেতন দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাদের কাজে ফেরা ও পাওনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো। এরপর তারা কীভাবে কুদ্দুসের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল করল? এর পেছনে অন্য কারও ইন্ধন রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জলিল তালুকদাররা শ্রমিকদের ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের ওই কারখানায় রেজিস্টার্ড ট্রেড ইউনিয়ন নেই। তারা ওই কারখানায় হামলা করতে যায় কীভাবে? তারপরও শ্রমিকরা তাদের পাওনা পাবে। কেউ চাইলে চাকরিও করতে পারে। বাংলাদেশের কোনো কারখানায় কখনো শ্রমিক অসন্তোষ ঘটবে না; যদি এর পেছনে কারও ইন্ধন না থাকে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি।’
