এ মাসের শেষে অথবা অক্টোবরের শুরুতে বাংলাদেশে চীনের করোনার সিনোভ্যাক কোম্পানির টিকা পরীক্ষা শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী সরকার। মানবদেহে টিকার পরীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রকে সব ধরনের অনুমতি দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। পরীক্ষার অংশ হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে সাতটি কভিড হাসপাতালকে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দেহে এ টিকার পরীক্ষা হবে। এখন হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য এসিসহ নানা ধরনের সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এসব হাসপাতালকে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আইসিডিডিআর,বির টিকা পরীক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষকরা বলছেন, চীন থেকে এখনো পরীক্ষার টিকা এসে পৌঁছেনি। আশা করছি আগামী সপ্তাহেই টিকা এসে পৌঁছবে। আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ দিচ্ছে। প্রশিক্ষণও চলছে। হাসপাতাল পরিদর্শন করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে কী কী সুবিধা আছে, গবেষকরা কোথায় বসবেন, যাদের টিকা দেওয়া হবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা রয়েছে কি না সব দেখা হচ্ছে। যে কক্ষে টিকা দেওয়া হবে ও টিকা রাখা হবে, সেখানে এসি, বাথরুমসহ আনুষঙ্গিক কাঠামো দরকার। ভ্যাকসিন রাখার জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার কক্ষ লাগবে। এসব প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আইসিডিডিআর,বিকে অনুমতি দিয়েছে ট্রায়াল করার জন্য। আইসিডিডিআর,বির এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে। যতদূর জানি, এ মাসের শেষে অথবা অক্টোবরের শুরুতে ট্রায়াল শুরু হবে। ভ্যাকসিন আসতে কিছুটা সময় লাগে। ভ্যাকসিনটা বিশেষ পদ্ধতিতে আনতে হয়। চীন থেকেই প্যাকিং হয়ে আসবে। দুই গ্রুপের কাকে কোনটা দেওয়া হবে, সেসব ঠিক করা থাকবে। ছয় মাসের মতো লাগে পুরো পরীক্ষা শেষ হতে। তারপর রেজাল্ট জানা যাবে ভ্যাকসিন করোনা প্রতিরোধে কার্যকর কি না।
এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব হাসপাতালে পরীক্ষা হবে, আমরা তাদের বলে দিয়েছি। সেগুলো ঠিক আছে। এখন ভ্যাকসিন এলেই পরীক্ষা শুরু করতে পারবে।
এদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার পরীক্ষা চলাকালীন পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেটি স্থগিত করা হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বাংলাদেশেও। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ভ্যাকসিনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভ্যাকসিন যেটা আবিষ্কার হলো আমরা তো আশাবাদী হয়েছিলাম অক্সফোর্ডেরটা নিয়ে। সেটা পরীক্ষা করতে গিয়েই যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল আমরা আবার একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে গেছি। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা আছে যে, পৃথিবীর যেখানেই আবিষ্কার হোক বাংলাদেশ, আমার দেশের মানুষের জন্য আমরা সেটা সংগ্রহ করতে পারব। সেই বিষয়টায় আমরা যথাযথ সচেতন।
তবে অক্সফোর্ডের করোনার টিকার পরীক্ষা সাময়িক স্থগিত হওয়ায় বাংলাদেশে আলাদা কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনা ট্রায়ালের পদ্ধতির অংশ। এর আগে বাংলাদেশে অনেক ওষুধ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। গবেষকরা টিকার নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে পরীক্ষা শুরু করবেন না।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্রায়ালের সময় যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তাতে ভ্যাকসিনের জন্য কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের ট্রায়াল যখন হয় তখন একটা ডেটাসেফটি বোর্ড থাকে। তারা পর্র্যবেক্ষণ করে কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হলে তারা দেখে, ট্রায়ালে যারা অংশ নিয়েছে, তাদের মধ্যে কারও বা কোনো অংশ অসুস্থ হলো কি না বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কি না। ট্রায়াল চলাকালে সাধারণত এরকম ঘটনা ঘটলে তখন পরীক্ষা স্থগিত রেখে ওই ঘটনা (যে অসুস্থ হলো) টিকার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটা বিশ্লেষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটা ট্রায়ালের একটা পদ্ধতি। এটা বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, স্থগিত করা হয়েছে। এখন জানবে এটা ভ্যাকসিনের কারণে হয়েছে কি না। এরপর সিদ্ধান্ত হবে এটা স্থগিত থাকবে নাকি আবার শুরু হবে। এটা গবেষণা পদ্ধতির একটা অংশ। এমনটা হতে পারে। আমাদের দেশেও অনেক স্টাডির ক্ষেত্রে এমন হয়েছে। দেখা গেছে ওষুধের কারণে হয়নি। পরে আবার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এটা একটা পদ্ধতির অংশ।
এ গবেষক বলেন, আমাদেরও যে সিনোভ্যাক টিকার পরীক্ষা হবে, সেখানেও এসব পদ্ধতি আছে। ওখানে বলা আছে, যদি কারও মধ্যে অসুস্থতা দেখা দেয়, সেটা বিশ্লেষণ হবে, যদি টিকার কারণে হয় তাহলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব গবেষণা টিম নেবে। ভ্যাকসিন ট্রায়ালের পদ্ধতির মধ্যে এসব পদ্ধতি লেখাই থাকে। পদ্ধতির একটা অংশ। তার মতে, এ অসুস্থ হয়ে পড়ার সঙ্গে ভ্যাকসিনের কোনো সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। এখন নিশ্চিত হবে যে এটা টিকার কারণে হয়েছে কি না। সাধারণত টিকা দিলে টিকা যে কাজ করছে সেটার কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। এটা তেমনও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিনের কিছু অ্যাডভান্সড প্রভাব গ্রেডিং করা আছে। গ্রেড-১ অনুযায়ী যেখানে টিকা দেওয়া হয়, সেখানে সুই ঢোকাতে গিয়ে মাংসপেশিতে কিছু ব্যথা হয়, সেখান থেকে জ্বর হতে পারে। এভাবে গ্রেডিং করা আছে। যেকোনো ট্রায়ালের অ্যাডভান্সড ইফেক্ট পরীক্ষা করতে ডেটাটেস্টিং বোর্ড থাকে। কমিটি থাকে। কমিটি দেখবে অসুস্থতার মূল কারণ কী। ভ্যাকসিন যাকেই দেওয়া হবে, তাকে পর্যবেক্ষণের মধ্যেই রাখা হয়। সে কমিউনিটি থেকে কিছু পেল কি না, সেটাও দেখা হয়।
অনুরূপ মত দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো একটি ভ্যাকসিন ট্রায়াল চলাকালে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে যান, তাহলে সেই ভ্যাকসিন ট্রায়াল আপাতত স্থগিত করা হয়। এটা ট্রায়ালের ক্ষেত্রে সাধারণ ঘটনা। ১৭ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবীকে ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। সাধারণ হিসেবে ১০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে দেওয়ার পর যদি কেউ অসুস্থ হন, তাহলে ওই ভ্যাকসিনের কারণে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এটা ওষুধ বা ভ্যাকসিন গবেষণায় এমনটাই জানা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষকরা জানান, রাজধানীর সাতটি কভিড হাসপাতালের ৪ হাজার ২০০ চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী স্বেচ্ছায় এ ট্রায়ালে অংশ নিতে পারবে। হাসপাতালগুলো হলো মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিট-১, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইউনিট-২ এবং ঢাকা মহানগর হাসপাতাল। সাফল্য এলে ভ্যাকসিন পাওয়ায় অগ্রাধিকার পাবে বাংলাদেশ। এর আগে প্রথম দুই ধাপে প্রাণীদেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফলাফলের তথ্য-উপাত্তে সফলতা মেলে। প্রথমে চীনে অ্যানিমেলের ওপর। তারপর ফেইস-১ স্টাডি হয়েছে ১৪৪ জনের ওপর এবং পরে ৬০০ জনের ওপর ফেইস-২ স্টাডি সম্ভব হয়েছে। তাতে দেখা গেছে ভ্যাকসিনটি নিরাপদ এবং এটি মানুষের দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) আইসিডিডিআর,বিকে পরীক্ষার অনুমোদন দেয়। তবে সরকারের অনুমতি পেতে সময় লাগে এক মাসেরও বেশি সময়। গত ২৮ আগস্ট সিনোভ্যাক টিকার পরীক্ষার অনুমতি দেয় সরকার। সেদিনই পরীক্ষার জন্য চীন থেকে সিনোভ্যাক কোম্পানির টিকা দেশে আনার অনুমতি দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সঙ্গে সঙ্গে অনুমতির কাগজপত্র চীনে কোম্পানির কাছে পাঠিয়েও দেয় আইসিডিডিআর,বি। সর্বশেষ যে হাসপাতালে পরীক্ষা করা হবে, সেসব হাসপাতালকেও নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন অপেক্ষা টিকা এসে পৌঁছানোর।
পরীক্ষা শেষে টিকার উৎপাদনে যেতে কত সময় লাগতে পারে জানতে চাইলে এক গবেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) পরীক্ষা শুরুর পর ছয় মাসও অপেক্ষা করবে না। তারা বলছে নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়ে দেবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ৪ হাজার ২০০ জনের মধ্যে দুই হাজার অংশগ্রহণকারীকে টিকা দেওয়ার পর তিন মাস পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। তাদের তথ্য নিয়ে মিডটার্ম রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে। এই মিডটার্ম রেজাল্ট সন্তোষজনক হলেই এফডিএ ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়ে দেবে। এটা ইমার্জেন্সি অ্যাপ্রুভাল। সে ক্ষেত্রে প্রথম দফায় উৎপাদিত টিকা খুব ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী (যেমন চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক মানুষ) পাবে।
এ গবেষক আরও জানান, পরীক্ষা সফল হলে দেশের তিনটি প্রতিষ্ঠান টিকা উৎপাদন করতে সক্ষম। এর মধ্যে ওষুধ কোম্পানি ইনসেপটা ও পপুলার ইতিমধ্যেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করে টিকা উৎপাদনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে বেক্সিমকো উৎপাদন করতে পারে। এসব কোম্পানি চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করবে। তারপর যাদের অনুমতি দেয়, তারাই উৎপাদন করবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি। কাজেই তিনটি কোম্পানির উৎপাদন করতে হতে পারে।
চীনার টিকার তৃতীয় ও শেষ পর্যায়ের পরীক্ষার চুক্তি অনুযায়ী কী সুবিধা পাবে বাংলাদেশ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষকরা জানান, সেটা গবেষণার প্রটোকলে উল্লেখ আছে। চুক্তিতে বলা আছে, টিকার পরীক্ষা সফল হলে সিনোভ্যাক বাংলাদেশকে টিকা তৈরির প্রযুক্তি হস্তান্তর (টেকনোলজি ট্রান্সফার) করবে। সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের কোম্পানি দেশেই টিকা উৎপাদন করতে পারবে। তবে এ রকম কোম্পানি দেশে আছে দুটি। তিন মাস আগে এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে ওষুধ কোম্পানি ইনসেপটা ও পপুলারের বৈঠক হয়েছিল।
