বিনিয়োগের অন্যান্য খাত সংকুচিত হওয়ায় পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য অর্থ জমা করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে লেনদেনে। এতে করে গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন আবারও ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে ডিএসইতে এত বেশি টাকা লেনদেন হয়েছিল।
২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা মূল্যের সিকিউরিটিজ। এরপর থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটের কারণে ধারাবাহিকভাবে দরপতনের সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও কমে গিয়েছিল। তবে চলতি বছর মে মাসে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) শীর্ষ পদে নতুন নেতৃত্বের বিভিন্ন উদ্যোগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ আসায় আবারও শেয়ারদর ও লেনদেন বাড়তে শুরু করেছে।
এদিকে তিন বছরের সর্বোচ্চ লেনদেনের দিনে পুঁজিবাজারের মূল্যসূচকেও বড় উত্থান হয়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা ও জ¦ালানি খাতের শেয়ারে ভর করে গতকাল ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৮২ পয়েন্ট বেড়ে ৫০৯৪ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। মাত্র দেড় মাসে এ সূচকটি বেড়েছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যা বিশ^ পুঁজিবাজারগুলোর মধ্যে ডিএসইকে এ সময়ের সবচেয়ে সেরা পারফর্মিং বাজার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালকদের নিজ কোম্পানির ন্যূনতম দুই শতাংশ শেয়ার ধারণ, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে বাধ্যবাধকতা আরোপের পাশাপাশি জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব এনে দিয়েছে। এর প্রভাবে গত ২৬ জুলাই থেকে শেয়ারের চাহিদা বাড়তে থাকায় সূচক ও লেনদেনে উন্নতি দেখা যায়। এ সময়ে প্রায় সব খাতের শেয়ার দর ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। আর গত ১০ সেপ্টেম্বর ডিএসইর প্রধান সূচকটির ৫ হাজার পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক বাধা টপকানোর পর গতকাল তালিকাভুক্ত অধিকাংশ শেয়ারের দর নতুন গতি পেয়েছে। বিশেষত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ¦ালানি ও বীমা খাতের অধিকাংশ শেয়ারের দর বেড়েছে। তবে সূচক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক খাত।
খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে ব্যাংক খাতের। এ খাতের ৩০ কোম্পানির বাজার মূলধন এক দিনে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। খাতটির ৩০ কোম্পানির সবগুলোর বাজারদর বেড়েছে। এ খাতে সবচেয়ে বেশি ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার থাকায় সূচকে ব্যাংকের প্রভাবও বেশি। গতকাল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজার মূলধন বেড়েছে এনবিএফআই খাতের, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সাধারণ বীমা ৩ শতাংশ, সেবা ও নির্মাণ ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং বস্ত্র খাতের ২ শতাংশ দরবৃদ্ধি সূচক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
ডিএসইর লেনদেন পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গতকাল অন্তত ৪৫ কোম্পানির শেয়ার দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হয়েছিল। তবে লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এ দরে স্থির ছিল ৩৬ শেয়ার, যার বেশিরভাগই জেড ক্যাটাগরির এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই এমন কোম্পানির।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, শনিবার মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএ আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম আবারও স্পষ্ট করে জানান, যেসব কোম্পানির পরিচালকদের ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার নেই, তাদের পদ ছাড়তেই হবে। না ছাড়লে তাকে অপসারণ করে প্রয়োজনে শূন্য পদে স্বতন্ত্র পরিচালক বসাবে এসইসি। তবে আর্থিক সংকটে কিছু কোম্পানির কয়েকজন পরিচালক শেয়ার কিনে কমিশনের নির্দেশনা পরিপালনে সময় চাওয়ায়, তাদের সময় দেওয়া হবে বলেও নিশ্চিত করেন তিনি। গতকালের শেয়ারবাজার লেনদেনে এর প্রভাব ছিল।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দর বৃদ্ধির শীর্ষে থাকা কোম্পানির বেশিরভাগই রুগ্ণ বা স্বল্প মূলধনী বা যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের এসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যূনতম শেয়ার নেই। ডিএসইতে দরবৃদ্ধির শীর্ষ দশের প্রথম তিনটিসহ মোট পাঁচ কোম্পানি ছিল জেড ক্যাটাগরিভুক্ত। এগুলো হলো গোল্ডেন সন, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, জুট স্পিনার্স এবং জিলবাংলা সুগার মিলস। পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গতকাল ডিএসইতে সার্বিকভাবে যেখানে ৬৩ শতাংশ শেয়ারের দরবৃদ্ধির বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ শেয়ারের দর কমেছে, সেখানে জেডভুক্ত প্রায় ৮৬ শতাংশের দর বেড়েছে। গড়ে এসব শেয়ারের বাজারদর বেড়েছে পৌনে ৫ শতাংশ। যেখানে এ ক্যাটাগরিভুক্ত ২৬২ শেয়ার ও ফান্ডের বাজারদর মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে বি ক্যাটাগরিভুক্ত ৫৪ শেয়ারের গড় বাজারদর কমেছে শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ।
