নকশাবহির্ভূত স্থাপনায় বাড়ছে কংক্রিটের জঞ্জাল

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:২০ এএম

রাজধানীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থান হিসেবে ইতিমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হাতিরঝিল। কিন্তু মূল নকশা লঙ্ঘন করে হাতিরঝিলের পুরো এলাকা ঘিরে একের পর এক গড়ে উঠছে নানা স্থাপনা। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে গত কয়েক বছরে নতুন ২৯টি স্থাপনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পে পুলিশ ফাঁড়ির জন্য জায়গা রাখা হলেও সেখানে হয়েছে থানা কমপ্লেক্স। মূল নকশাবহির্ভূত এসব স্থাপনার ব্যাপারে হাতিরঝিল প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি কমিটিও করা হয়েছিল। সেই কমিটি এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত হাতিরঝিল প্রকল্পে থাকা মূল নকশাবহির্ভূত সব স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল নকশা লঙ্ঘন করে নকশাবহির্ভূত স্থাপনা গড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রকল্পের মূল নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্থপতি ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতিরঝিলের মূল নকশাবহির্ভূত সব স্থাপনা অবৈধ। এসব স্থাপনা উচ্ছেদে জোরালো দাবি জানাচ্ছি। এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ির জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। সেখানে থানা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমন একটি জায়গায় থানা কমপ্লেক্স কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ পুলিশ ফাঁড়ি আর থানা দুটি ভিন্ন বিষয়। থানার জন্য অনেক বেশি জায়গা ও কার্যক্রম প্রয়োজন হবে। প্রকল্পের ভেতরে গণপরিসরে থানা হওয়ার নজির নেই। থানা করতে হলে এর আশাপাশে জমি অধিগ্রহণ করে করা যেত। আমি এখনো বিশ্বাস করতে চাই যে এখান থেকে থানা কমপ্লেক্স অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে।’

হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতিরঝিলের মূল পরিকল্পনায় থানা কমপ্লেক্স বা দোকান হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু পরে দেখলাম বিপুলসংখ্যক দোকান বসানো হয়েছে। একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় এমন কার্যক্রম করা ঠিক হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দোকানগুলো উচ্ছেদে আমরা কর্র্তৃপক্ষকে বলেছি। দুই বছর আগে একটি সভা হয়েছিল। সেখানে তা বলেছি। কিন্তু এখনো দেখি দোকানপাট রয়ে গেছে। তবে সময়ের চাহিদায় মেরুল বাড্ডা অংশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য পরিকল্পনা করে মানানসই ছোট স্থাপনা করতে পারে। কিন্তু তা অবশ্যই পানি চলাচলে যেন বিঘ্ন না ঘটায়।’

হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল নকশাবহির্ভূত স্থাপনা উচ্ছেদে উচ্চ আদালতের দেওয়া নির্দেশনার ব্যাপারে জানতে চাইলে হাতিরঝিল প্রকল্পের রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) অংশের একজন প্রকৌশলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা আবার আরেকটি পক্ষ স্থগিতও করেছে। তাই এ মুহূর্তে উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাতিরঝিলে আসা দর্শনার্থীদের কথা চিন্তা করে কিছু ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান ইজারা দেওয়া হয়েছে। পরে দেখা গেছে তা দেখতে ভালো দেখাচ্ছে না। বরাদ্দের শর্ত ভেঙে তারা নির্ধারিত স্থানের বেশিও ব্যবহার করছে। এসব বিষয়ে ইতিমধ্যে আমরা কাজ করছি।’

সরেজমিনে দেখা যায়, হাতিরঝিলের মূল নকশা ভেঙে ছোট-বড় ২৯টি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি দোকানই স্থায়ী। বাকি ১৮টি দোকানের মধ্যে কয়েকটি অস্থায়ী ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। দোকানগুলো বেশির ভাগ গড়ে উঠেছে ঝিলের পাড় ঘেঁষে। অনেক দোকানি নিজেদের ইচ্ছামাফিক জায়গা ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে হাতিরঝিলের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে সবুজায়নও কমছে। অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক টিনের ছাউনি, কংক্রিট ও কাঠের পাটাতন, ত্রিপল-ছাতা আর চেয়ার-টেবিল দিয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। গুলশান পুলিশ কনকর্ড প্লাজাসংলগ্ন ‘তন্দুরি কাবাব’, এর একটু সামনে এলে ‘ঝিলমিল’, মেরুল অংশে ‘ফুড মোবাইল’ এবং রামপুরা ব্রিজসংলগ্ন ‘ফুড মোবাইল অ্যান্ড চায়না গ্রিল’ নামে এসব খাবারের দোকান রয়েছে। কয়েকজন রেস্টুরেন্ট মালিক জানান, তারা ৭৫ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় এসব দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে। এখন মাঝপথে তাদের উচ্ছেদ করলে ব্যবসায়িকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ছাড়া করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর ব্যবসা প্রায় বন্ধ। হাতিরঝিলের উত্তর-পূর্ব অংশে হাতিরঝিল থানা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে বেশ কিছু এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই থানা। লেকের পাড়ে থানা নির্মাণের বিষয়ে বিভিন্ন মহলের আপত্তিও রয়েছে।

জানতে চাইলে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানে থানা করার কথা ছিল না। সেখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি করার জায়গা রাখা হয়েছিল। এখন সময়ের চাহিদায় হয়তো থানা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউক চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

প্রকল্পের নকশা ভেঙে ফাঁড়ির বদলে থানা করার বিষয়ে জানতে চাইলে

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. হারুন অর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে ফাঁড়ি না থানা হওয়ার কথা, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি না জেনে মন্তব্য করতে পারব না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত