করোনাকালের দগদগে সংকটের মধ্যেও আশা জাগানিয়া কত কী ঘটেছে! বজ্রঝড় আর সংক্রমণ সামলে গোলায় ধান তুলেছেন কৃষক। ঘূর্ণিঝড় আম্পান আর তিন দফা বন্যা সামলে ঘাড় তুলেছে ডুবে-ভেসে থাকা সব সাহসী সংসার। এর ভেতরেই ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় উদ্বোধন হয়েছে ‘বৈশ্বিক অভিযোজন কেন্দ্র’ (জিসিএ) দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক কার্যালয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন যৌথভাবে এই কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। উপস্থিত ছিলেন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীসহ ভারত, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট শ্রদ্ধেয়জন। ‘গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন’ বা ‘জিসিএ’ হলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গঠিত নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এক পহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। ২০১৭ সালে এটি যাত্রা শুরু করে। আমাদের প্রত্যাশা, জিসিএ আঞ্চলিক কেন্দ্র নিম্নবর্গের টিকে থাকার কৌশল ও কারিগরি বিষয়সমূহের স্বীকৃতি ও মর্যাদার একটা পরিসর তৈরি করবে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, সভা থেকে সংগঠন, পাড়া থেকে গ্রাম, দেশ থেকে বিশ্ব সবার জলবায়ু চর্চা ও খাপ খাওয়ানোর অভিজ্ঞতাগুলোকে সমন্বয় করবে। জিসিএর আঞ্চলিক কেন্দ্র সমীপে কিছু প্রাথমিক প্রস্তাব ও শঙ্কা তুলে ধরতেই এই চলতি আলাপ।
অভিযোজনের ব-দ্বীপ বাংলাদেশ : অভিযোজন কী? অভিযোজন কেন? বৈশ্বিক জলবায়ু ডিসকোর্সে ‘প্রশমন’ ও ‘জলবায়ু দেন-দরবারের’ সঙ্গে ‘অভিযোজন’ সর্বাধিক আলোচিত প্রসঙ্গ। অভিযোজন এক নিয়ত পরিবর্তনশীল চর্চার পরিসর। নানামাত্রায় নানা পরিসরে এর চর্চা ও ধরন ভিন্ন হয়। জলবায়ু সংকট ও অভিঘাত মোকাবিলায় নানা অঞ্চলে বিশেষত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রতিদিন নানাভাবে টিকে থাকার লড়াই করে। এভাবেই টিকে থাকা, মানিয়ে নেওয়া ও খাপ খাওয়ানোর নানা রীতি, কারিগরি, বিজ্ঞান ও চর্চা গড়ে ওঠে। বিকশিত হতে থাকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজনের রসায়ন। কৃষি ও জুমনির্ভর বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের ইতিহাস সুপ্রাচীন। খনার বিজ্ঞান থেকে শুরু করে লোকায়ত আবহাওয়াপঞ্জিকা কী প্রতিবেশভিন্নতায় নানামুখী গ্রামীণ কারিগরি কৌশলগুলো তার প্রমাণ। যেমন মধুপুর গড়ের পত্রঝরা শালবনের মান্দি আদিবাসীরা বনের উইঢিবিগুলো সংরক্ষণ করেন। কারণ উইঢিবির ভেতর দিয়ে সারাবনের ভেতর উইপোকারা জালের মতো সূক্ষ্ম নালা তৈরি করে। বর্ষা মৌসুমে রুক্ষ শালবনের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে বৃষ্টির জল। বরেন্দ্রভূমির কোল আদিবাসীরা বর্ষার আগে বাউই পাখির বাসার প্রবেশমুখের দিক দেখে ঘর মেরামত করেন, কারণ সেটি ঝড়ের গতিপথ নির্দেশ করে। হাওরাঞ্চলে বর্ষার আগেভাগেই ভাটিবাড়ির চারধার ঢোলকলমী, বনতুলসী, বিন্যাছুবা, হিজল, করচ, বরুণের ঘের দিয়ে মজবুত করা হয়, যাতে আফালে বসতির ক্ষতি না হয়। চান্দারবিলসহ দেশের দক্ষিণে গড়ে উঠেছে গাউতা বা ধাপ চাষের মতো ভাসমান কৃষিরীতি। মৌলভীবাজারের খাসিপুঞ্জিগুলো উৎরামের মতো সংক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে পানজুমে সবার প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। পাহাড়ি এলাকার জুম চাষে মিশ্রফসল নির্বাচন, লবণাক্ত এলাকায় কনকনা পদ্ধতি, বরেন্দ্র অঞ্চলে ছোট জাউন সেচ, হাওরে ঝুলন্ত বীজতলা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নানামুখী সেচ, উপযোগী শস্য ফসলের জাত নির্বাচন এ রকম অযুত-নিযুত টিকে থাকার বিজ্ঞান ও কারিগরি আছে দেশ জুড়ে। কেবল গ্রামীণ জীবনে নয়, বিদ্যায়তন থেকে শুরু করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও নানাভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলার নানা কৌশল ও নতুন উপকরণ ও শস্যফসলের জাত নির্বাচন নিয়ে কাজ করছে বহু দিন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন’ তৈরি করে। পরে ২০০৯ সালে তৈরি করে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা’। ১৯৯৮ সাল থেকে লোকায়ত জ্ঞান ও নিম্নবর্গের টিকে থাকার বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুনিয়ায় অনন্য উদাহরণ তৈরি করতে পারে। জলবায়ু বিপর্যস্ত দুনিয়াকে টিকে থাকার নানা লোকায়ত বিদ্যা, কৌশল ও সাহস জানাতে পারে।
সমন্বয় ও বিস্তার : বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে গ্রামীণ নিম্নবর্গের জলবায়ু চর্চা আছে। আছে খাপ খাওয়ানোর দারুণসব কাহিনী। এসব চর্চা ও লোকায়ত অভিযোজন কারিগরির যথাযথ নথিভুক্তকরণ জরুরি। সামগ্রিকভাবে এসব চর্চার বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ ও গবেষণা জরুরি। জিসিএ এসব সমন্বয়, গবেষণা এবং সামগ্রিকভাবে প্রাপ্ত সব তথ্য-উপাত্ত সবার জন্য পাবলিক শিখন উপকরণ হিসেবে সরবরাহ করতে পারে। শ্রীলঙ্কার একজন উপকূলীয় জেলের টিকে থাকার গল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলের একজন জেলে জীবনের টিকে থাকার গল্পের মেলবন্ধন ঘটাতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে নথিভুক্তকরণ, গবেষণাপদ্ধতি এবং তথ্য সরবরাহ সবকিছুর ক্ষেত্রে অবশ্যই সব দেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। নথিভুক্তকরণ ও গবেষণা সমন্বয় সব ক্ষেত্র অবশ্যই জনগোষ্ঠীর পূর্বসম্মতি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জিসিএ আঞ্চলিক কেন্দ্র যেসব তথ্য সরবরাহ করবে, বিশেষত স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন ও লোকায়ত চর্চাবিষয়ক সে ক্ষেত্রে সব বিবরণ অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের ভাষাতেই অনুবাদ করা জরুরি। এমনকি বিশেষ মানুষদের জন্য ভিডিও, আলোকচিত্র ও অডিও রাখা দরকার। কৃষিপ্রতিবেশ, হাইড্রোলজিক্যাল রিজিয়ন, দুর্যোগ ও জলবায়ু অভিঘাতের ধরন ও জন-উদ্যোগ ভিন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযোজন বিবরণসমূহ সন্নিবেশিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে লোকায়ত জ্ঞান এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনগোষ্ঠীভিত্তিক অভিযোজন নিয়ে কর্মরতদের অভিজ্ঞতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ কাজটিকে আরও প্রায়োগিক করে তুলবে।
মেধাস্বত্ব ও স্বীকৃতি : গ্রামীণ নিম্নবর্গের লোকায়ত জ্ঞান ও প্রাণসম্পদ নিয়ে একতরফা করপোরেট প্রাণ ও জ্ঞানডাকাতি আজ আর কোনো লুকোছাপার বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে জিসিএ এক অভিন্ন ‘জনগোষ্ঠীভিত্তিক মেধাস্বত্ব অধিকার নীতি’ গ্রহণ করতে পারে, যেখানে দেশ ও অঞ্চলভিন্নতায় বিশেষ প্রস্তাবগুলোকে যুক্ত করা জরুরি। কারণ কোনো গ্রামীণ অভিযোজন কৌশল গবেষণা বা নথিভুক্তকরণের নামে যদি একরতফা বাণিজ্যিক মুনাফা করা হয় বা ব্যবহার করা হতে থাকে, তবে তা স্থানীয় অভিযোজনের মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করে। আশা করব জিসিএ সব অঞ্চলের সব জনগোষ্ঠীর শ্রেণি-বর্গ-পেশা-জাতি-লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়ে সবার মৌলিক মেধাস্বত্বের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। এমনকি লোকায়ত জ্ঞান ও বিদ্যায়তনিক জ্ঞানের নানামুখী তর্ককে সমন্বয় করার কার্যকর পন্থা গ্রহণ করবে।
অভিযোজনের নামে করপোরেট বাণিজ্য! : জলবায়ু সংকটের প্রসঙ্গ বৈশ্বিক আলোচনায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই দুনিয়ার মারদাঙ্গা করপোরেট কোম্পানিরা ‘জলবায়ু অভিযোজন’ বাণিজ্য ঘোষণা করেছে। সিনজেনটা, মনস্যান্টো, বিএএসএফ, ডুপন্ট, বায়ায়ের মতো কোম্পানিগুলো বন্যাপ্রতিরোধী, খরাপ্রতিরোধী, লবণাক্ততা সহনশীল নানা ‘জলবায়ু সহনশীল বীজের’ ঘোষণা দিচ্ছে। তারা ইতিমধ্যেই ‘ক্লাইমেট রেডি জিন’ হিসেবে অনেক সহনশীল জাত পেটেন্ট করেছে। এর সঙ্গে আছে নানা উপকরণ ও বিলাসিতার বাণিজ্য। যখন দুনিয়া ধুঁকছে জলবায়ু বিপর্যয়ে, বাংলাদেশের মতো দেশের গ্রামীণ জনগণ দুনিয়াকে বাঁচাতে মরিয়া, তখন এসব করপোরেট কোম্পানির এমন প্রক্রিয়া সত্যিকারের অভিযোজন সক্ষমতাকে বিনষ্ট করে। জিসিএকে জনগণের সত্যিকারের অভিযোজন কৌশল ও জ্ঞানপ্রক্রিয়ার পাশে দাঁড়াতে হবে। সব তথ্য ও কারিগরির জনমালিকানা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হতে হবে। কোনো কর্মসূচি বা কৌশল বা জাত জনগোষ্ঠীর ভেতর নিয়ে যাওয়ার আগে তার সামগ্রিক জনমত ও প্রতিবেশগত যাচাই জরুরি। আশা করি জিসিএ এখন থেকে এই কাজগুলো সমন্বয়ের একটা জায়গা তৈরি করতে পারবে।
জলবায়ু ন্যায্যতা : নানাভাবে ঢাকা দূষিত বায়ুর নগর হলেও বাংলাদেশ কোনোভাবেই বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত তাই জানান দেয়। এখানকার গ্রামীণ নিম্নবর্গ তার জীবনধারণের জন্য যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে, সেই জীবনকে অনেকে বলে থাকেন ‘কার্বন নিরপেক্ষ বা কার্বন ঋণাত্মক’। কিন্তু আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, চীনের লাগাতার ভোগবিলাসিতার জীবন ও অপরিণামদর্শী উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আমাদের নীলগ্রহের ওপর প্রতিদিন বিছিয়ে দিচ্ছে নিদারুণ কার্বন পদচ্ছাপ। এ আবার কেমন বৈষম্যের দুনিয়া? একদিকে ধনীর দুলালেরা যাচ্ছেতাই ভোগবিলাসিতা করবে আর বাংলাদেশের মতো গ্রামজনপদের মানুষরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যায় ডুববে, ঘূর্ণিঝড়ে ভাসবে। আর এই বৈষম্যের ময়দানে দাঁড়িয়ে একের পর এক টিকে থাকার লড়াই করে যাবে। প্যারিস চুক্তিসহ আন্তর্জাতিক নীতিগুলো সব দেশকেই মানতে হবে। যারা আজ বেশি কার্বন নির্গমন করছে, তাদের অভ্যাস পাল্টাতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। মুনাফা নয়, পারস্পরিক নির্ভরশীল প্রাণজগতের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের অভিন্ন দিশা নির্ধারণ করতে হবে। ধনী ও উন্নত দেশকে প্রশমন এবং জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নে সক্রিয় হতে হবে। অভিযোজন সবার জন্যই সাম্য ও ন্যায়ের সুফল বণ্টন করে। আর এই অভিযোজন সক্ষমতার জন্য অর্থায়ন জরুরি।
আশা করব, জিসিএর আঞ্চলিক কার্যালয় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল নিশ্চিতকরণে একটা জোরালো ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এই কেন্দ্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ নিম্নবর্গের জলবায়ু চর্চা এবং কার্বন-নিরপেক্ষ জীবনকে দুনিয়ার সামনে উপযোগী করে তুলে ধরার প্রয়াস অব্যাহত রাখবে, যা সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক ক্ষমতা ও মুনাফার ময়দানকে প্রশ্ন করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান প্রভাবকগুলো চিহ্নিত করে দুনিয়ার জন্য দারুণ সব বিকল্প আশা জাগানিয়া আখ্যান উপহার দিতে পারে। আর এমন সব জলবায়ুবান্ধব আখ্যানে অভ্যস্ত হতে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে বৈশ্বিক প্রচার অব্যাহত রাখবে। আশা করি বাংলাদেশের মতো কার্বন-নিরপেক্ষ জীবনদর্শনে এক দিন মুখ ফেরাবে বিশ্ব। আর আমরা জিসিএর আঞ্চলিক কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে এমন সব বার্তাই দুনিয়ায় তুলে ধরতে পারি। করোনাকালে নানা শঙ্কা আর সংকটের ভেতরেও ‘বৈশ্বিক অভিযোজন কেন্দ্র’-এর আঞ্চলিক কেন্দ্র আরেকটি আশার বার্তা। করোনাকালে যেমন আমরা সবাই লড়ছি, এই আশার বার্তাকে সজাগ রাখতেও আমাদের সবাইকে সক্রিয় হতে হবে।
লেখক প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণবিষয়ক গবেষক
