চেক ডিজঅনার হলেই সাজা হবে না মর্মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, এখন থেকে চেকদাতা ও চেক গ্রহীতার মধ্যে লেনদেন সম্পর্কিত বৈধ চুক্তির প্রমাণ থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট মামলার বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে কী ধরনের চুক্তি বা বিবেচনায় চেকদাতা চেক ইস্যু করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং আপিল বিভাগের অপর বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি প্রকাশ হয়। চেক ডিজঅনার মামলা সংক্রান্ত একটি আপিল আবেদন নিষ্পত্তি করে গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ রায় দেয় আপিল বিভাগ। এতদিন চেক ডিজঅনার হলেই চেকদাতাকে সাজা দেওয়া হতো। সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়ের ফলে এখন থেকে চেকের বৈধ বিনিময় প্রমাণে ব্যর্থ হলে কোনো চেকদাতাকে সাজা দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে চেকপ্রাপ্তির বৈধ কারণ থাকতে হবে। যদি প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারের ভিত্তিতে চেক প্রদান করা হয় এবং সেই প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার যদি বাস্তবায়িত না হয় তাহলে চেক প্রদানকারীর টাকা পরিশোধে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না এবং চেক গ্রহীতার কোনো অধিকার তৈরি হবে না।
মামলার নথিপত্র ও আইনজীবীরা জানান, সাবেক কূটনীতিক কায়সার রশিদ চৌধুরীর স্ত্রী (মৃত) সামছি খানমের মালিকানাধীন উত্তর গুলশানের ৩০ কাঠা জমি ১৯৭৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সম্পাদিত ইজারা চুক্তি মূলে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসকে ১১০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। ওই ইজারা চুক্তিটি যেহেতু রেজিস্ট্রি (নিবন্ধন) করা হয়নি এবং বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে মৃত সামছি খানমের উত্তরাধিকাররা যথাক্রমে ইমরান রশিদ চৌধুরী, পারভেজ রশিদ চৌধুরী এবং জিনাত রশিদ চৌধুরী জমিটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। এরপর আবুল কাহের শাহিন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে ২০১২ সালের ১৩ মার্চ ইমরান রশিদ চৌধুরীর চুক্তি হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী, ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শাহিন জমির বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকায় বিক্রি করে দিতে পারবেন এবং এর জন্য শাহিন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ১৩ শতাংশ টাকা পাবেন। এরপর ইমরান রশিদ চৌধুরী পরবর্তী তারিখ উল্লেখ করে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার চারটি চেক আবুল কাহের শাহিনের নামে ইস্যু করেন। কিন্তু ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও শাহিন জমির ক্রেতা জোগাড়ে ব্যর্থ হওয়ায় চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০১২ সালের ১৬ আগস্ট জমির ইজারা গ্রহীতা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সঙ্গে জমির মালিকরা একটি বায়না চুক্তি সম্পাদন এবং ২০১৩ সালের ৩ জুলাই বিক্রি সংক্রান্ত দলিল সম্পাদন করেন। একপর্যায়ে শাহিনকে চেকগুলো ফেরত দিতে বললেও শাহিন ওই পরবর্তী তারিখ দেওয়া চারটি চেক ফেরত না দিয়ে নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করেন। ইতিমধ্যে ইমরান রশিদ চৌধুরী ওই চেকগুলো সম্পর্কে ব্যাংকে ‘স্টপ পেমেন্ট ইন্সস্ট্রাকশন’ দিয়ে রাখলে সেগুলো যথারীতি ডিজঅনার হয়। এরপর শাহিন সিলেটের আদালতে চেক ডিজঅনারের মামলা করে তার পক্ষে রায় পান। রায়ে ইমরান রশিদ চৌধুরীর এক বছরের কারাদ- এবং চেকের সমপরিমাণ সাড়ে চার কোটি টাকাসহ আরও সাড়ে চার কোটি টাকা জরিমানা করে এ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে দেওয়ার রায় হয়। ইমরান রশিদ চৌধুরী আপিলের শর্তে জামিন পান।
অধস্তন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্বে ইমরান রশিদ চৌধুরী হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল করেন। হাইকোর্ট শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট আপিল মঞ্জুর করে রায় দেয়। রায়ে ইমরান রশিদ চৌধুরী অভিযোগ থেকে খালাস পান। এরপর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আবুল কাহের শাহিন আপিল বিভাগে যান।
আদালতে বাদী পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও চৌধুরী মুর্শেদ কামাল টিপু। অপরপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মওদুদ আহমদ ও এ এম আমিন উদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ মাসুদ।
