ভারতীয় গণতন্ত্রের জনপ্রিয় ট্যাগ লাইন এই মুহূর্তে নিঃসন্দেহে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’। সোজা বাংলায় সবার সঙ্গে মিলেমিশে এদেশের বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। গণতন্ত্রে এর চেয়ে বেশি চাওয়া আর কী বা থাকতে পারে! ভারতে গণতন্ত্রের যে সোনার যুগ আসতে চলেছে আমরা তখনই বুঝতে পেরেছিলাম প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পরেই সংসদ ভবনে ঢোকার ঠিক আগে ভারতে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি সিঁড়ির ওপর উপুড় হওয়ার ঘটনা থেকে। সংসদীয় গণতন্ত্রকে মন্দির জ্ঞানে প্রণাম করতে।
শোনা যায় অনেক দিন আগে শেষবারের মতো কন্যাকুমারিকায় ভারতের শেষ সীমানার ধারে এক পাথরের ওপর বসে চোখ বুজে স্বামী বিবেকানন্দ তার ধ্যানের ভারতকে দেখতে পেয়েছিলেন। সে ভারতে কোনো ইশ্বর ভাবনা ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দের চোখে ভেসে উঠেছিল গরিব দেশ, জাতপাতের দ্বন্দ্বে জর্জরিত স্বদেশ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন। বিবেকানন্দের ধ্যানের লক্ষ্য ছিল অন্ধকার থেকে আলোর পথ খোঁজা। এখন আবার বিবেকানন্দের ডাক নাম নরেন্দ্র নাথ আর আমাদের নরেন্দ্র ভাই বিজেপির প্রচারে এক হয়ে উঠেছেন। একজন সাবেক ভারতের আর একজন আধুনিক দেশের।
আধুনিক যিনি স্বাভাবিকভাবেই শিবজ্ঞানে জীবসেবার মতোই সংসদীয় মন্দিরেই কন্যাকুমারিকার স্টাইলে ধ্যানের মধ্য দিয়ে নতুন এক আধুনিক ভারতকে দেখতে পেলেন। সে ভারত এক চমৎকার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে! নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এদেশের গণতন্ত্রের সুবাতাস বইছে একেবারে হু হু করে!
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আবার সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী। কত কিছুই যে নতুন নতুন বিষয় শিখছি! যেমন সন্ন্যাসী মানে জানতাম জাতপাত সাম্প্রদায়িকতার ঘোর বিরোধী। এই যোগীজি কিন্তু তথাকথিত কোনো নিরপেক্ষতার ধার ধারেন না। প্রকাশ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নিরন্তর বিদ্বেষ জনমনে চারিয়ে দিয়ে আসছেন অক্লান্ত দক্ষতায়। তার রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। যৌন হেনস্তা, মব লিঞ্চিং এখানে প্রায় রোজকার ঘটনা। শুধু মুসলিম নয়, দলিতদের ওপর অত্যাচারের ঘটনাতেও যোগী আদিত্যনাথ অনেক এগিয়ে। ইতিহাসের চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতেও যোগীজির জুড়ি নেই । তিনি প্রাচীন মোগলসরাই স্টেশনের নাম পাল্টে আরএসএসের তাত্ত্বিক নেতা দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নামে রেখেছেন ।
তিনি এতটাই মুঘলবিদ্বেষী যে প্রকাশ্যে বলতে পারেন যে ভারতের ইতিহাসে মুঘল পাঠানদের কোনো অবদান নেই। এভাবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রীতি বার্তা, সবকা সাথ সবকা বিকাশ পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। সবকা বিকাশ তো বটেই। বিকাশের অর্থনৈতিক ছবিটা একবার দেখে নিতে পারেন। করোনা ও লকডাউনের মাঝে নরেন্দ্র ভাই প্রিয় দেশবাসীকে আবেদন করেছিলেন যে, এসময় রাজনীতি করবেন না। সবাই মিলে দেশের স্বার্থে সরকারের পাশে থাকুন। আচমকাই লকডাউন ঘোষণা হওয়ার ফলে বিভিন্ন রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরার আকুতি সারা বিশ্ব দেখেছে। দেখেছে ক্লান্ত অবসন্ন শ্রমিকদের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ার মর্মান্তিক দৃশ্য।
কিংবা সেই বাচ্চা জামলো মকদম, তিন দিন ধরে সামান্য জলটুকুও না পেয়ে বাড়ির কাছাকাছি এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ছোট্ট শরীর নিথর হয়ে গেল। কত কত পরিবার শেষ হয়ে গেছে এ কয়েক মাসে সরকারের কাছে আজ তার কোনো তথ্য নেই। এ সরকারের শাসনামলের মতো ভারতের জিডিপি এত তলানিতে কখনো পৌঁছায়নি। বন্ধ হয়ে গেছে ছোট মাঝারি অজস্র শিল্প। আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ভুখা মানুষ। গণতন্ত্রের প্রহরী তখন বেজায় ব্যস্ত কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাম মন্দির নির্মাণে। তলানিতে ঠেকা অর্থনৈতিক কালে, এই অন্ধকার সময়ে ভারতের ধনীদের রমরমা বেড়েছে। শেষ ছয় মাসে এদেশে নতুন করে অন্তত ১৫ জন বিলিয়নিয়ার হয়েছেন। ১৩৮ কোটির ভারতে মোট বিলিয়নিয়ার এখন ১১৭জন। এই ধনীদের মিলিত সম্পত্তি ৩০ হাজার কোটি ডলার। এশিয়ার সব থেকে বড়লোক ভারতের মুকেশ আম্বানি। টাকার অংকে সম্পদের পরিমাণ ৮, ৮২০ কোটি ডলার। এই বিলিয়নিয়ার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আদানি, শিব নাদার কে নেই! সবচেয়ে ‘গরিব’ বালকৃষ্ণ গোয়েঙ্কার আয় মোটে ১০০ কোটি ডলার। আর এই ছয় মাসে সরকারের নানা দপ্তরে তত্ত্ব তালাশ করলে যে হিসাবটা পাওয়া যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট যে ইতিমধ্যেই কাজ চলে গেছে কম করে হলেও ৪১ লাখ লোকের।
এ এক অশ্লীল গণতন্ত্র। যেখানে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি নতুন করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হচ্ছে। দিল্লি দাঙ্গার সব দায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে এন আর সি এবং সি এ এ নিয়ে প্রতিবাদী তরুণদের ওপর। হালের ‘লৌহমানব’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর দিল্লি পুলিশ এগারো লাখ পাতার চার্জশিট দাখিল করেছে সবে সবে গ্রেপ্তার হওয়া জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা উমর খালিদের বিরুদ্ধে। এর আগেও উমরের বিরুদ্ধে যে ধারায় মামলা করা হয়েছে সেই ইউএপিএতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কলেজছাত্রী সফুরা জারগার, মিরান হায়দার, শারজিল ইমামকে। একইভাবে জেলে ঢোকানো হয় কাশ্মীরের চিত্র সাংবাদিক ছাব্বিশ বছর বয়সী মাসরাত জাহরাকে। স্রেফ কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্ট লেখার ‘অপরাধে’ হিন্দু পত্রিকার সাংবাদিক পিরজাদা আশিককেও রাষ্ট্র বিরোধিতার আইনে ধরা হয়। কত আর নাম লিখব! কেউই তো আজ আর আমরা নিরাপদ নই। এ লেখা লিখতে লিখতেই ভাবছি এসব খোলাখুলি লেখার দায়ে জেলে যেতে না হয়। বিরুদ্ধ মত, ভিন্ন চিন্তা মানেই রাষ্ট্র বিরোধিতা এই অদ্ভুত ধারণা আজ শুধু সরকারের মধ্যে নয়। ছড়িয়ে গিয়েছে জনগণের বড় অংশের মধ্যে ভয় সেটাই।
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগীজির কথা না বললে কোনো আখ্যানই শেষ হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গ্রেপ্তার হলেন বাহরাইচ গ্রামের এক বাসিন্দা। তিনি নাকি গরু হত্যা করেছেন। উত্তর প্রদেশে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে এখন অবধি গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩৯ জনকে। তার মধ্যে ৭৬ জনই গো হত্যার অভিযোগে ধৃত। ভাবুন একবার, গো হত্যা আর রাষ্ট্র বিরোধিতা এক সারিতে চলে এসেছে। আসলে এর পেছনে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে ফোবিয়া বা বিদ্বেষের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা দখলের নীতি শক্তিশালী করা। বিদ্বেষের পরিসর তৈরি করেই নানা ছুঁতোয় কোণঠাসা করা হচ্ছে শুধু দলিত মুসলিম নয়, সামগ্রিকভাবে মোদিবিরোধী লড়াইকেই। বিশিষ্ট কবি ভারভারা রাও, মানবাধিকারকর্মী গৌতম নাওলাখার, আনন্দ তেলতুম্বেকে এর আগেই জেলবন্দি করে রেখেছে এই সরকার। পশ্চিমবঙ্গের তরুণ বিজ্ঞানী পার্থ সারথি রায়কেও তলব করা হয়েছে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ।
দিল্লি দাঙ্গায় ধারেকাছে না থেকেও জেলে দেওয়া হচ্ছে উমর খালিদকে। এমনকি ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে সীতারাম ইয়েচুরির মতো মূলধারার বামপন্থি নেতা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষকেও। অথচ সবাই জানে যে দুজন সরাসরি দাঙ্গায় উসকানি দিয়েছিল সেই প্রভাবশালী বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র ও অনুরাগ ঠাকুরের নাম দিল্লি পুলিশের কোনো তালিকায় নেই। এভাবে অর্থনীতি রাজনীতির সাঁড়াশি আক্রমণে বিবর্ণ চেহারা নিচ্ছে ভারতের গণতন্ত্র। সবকা সাথ সবকা বিকাশ বা সংসদকে গণতন্ত্রের মন্দির বলে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম সবই হয়ে পড়ছে বাইরের আড়ম্বর। ভোটে জেতার কৌশল মাত্র।
লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
