মসজিদে বিস্ফোরণে মৃত্যু বেড়ে ৩৩

চার প্রকৌশলীসহ তিতাসের আটজন গ্রেপ্তার

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৩৮ এএম

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলায় তিতাস গ্যাসের চার প্রকৌশলীসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটকের পর আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিআইডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সিআইডির ডিআইজি মাইনুল হাসান।

গ্রেপ্তাররা হলেন- তিতাস গ্যাস ফতুল্লা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম (৪২), উপ-ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান রাব্বী (৩৪), সহকারী প্রকৌশলী এস এম হাসান শাহরিয়ার (৩২), সহকারী প্রকৌশলী মানিক মিয়া (৩৩), সিনিয়র সুপারভাইজার মুনিবুর রহমান চৌধুরী (৫৬), সিনিয়র উন্নয়নকারী আইউব আলী (৫৮), হেলপার হানিফ মিয়া (৪৮) ও কর্মচারী ইসমাইল প্রধান (৪৯)। এর আগে মসজিদে বিস্ফোরণে ঘটনার পর কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে এই আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ।

সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি মাঈনুল বলেন, ‘মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় গাফলতি থাকায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সাময়িক বহিষ্কৃত তিতাসের এই আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মামলার তদন্তের কাজ অগ্রসর হয়েছে। তিতাসের কর্মকর্তাদের অবহেলার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। মসজিদ কমিটির গাফিলতি পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।’

এদিকে গতকাল তিতাসের গ্রেপ্তার এই ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে (বরখাস্ত) ৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওসার আলমের আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাদের প্রত্যেককে ২দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ চলাকালে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দগ্ধ ৩৭ জনকে ঢাকা মেডিকেলের শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল পর্যন্ত ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও তিনজন এখনো চিকিৎসাধীন।

ওই ঘটনায় পরদিন তিতাস, ডিপিডিসি, মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু সংঘটনের’ অভিযোগ এনে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ মামলা দায়ের করে, যার তদন্ত করছে সিআইডি। সেই রাতের ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে ছয়টি এসি একসঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ার কথা বলা হলে পরে গ্যাস থেকে দুর্ঘটনা ঘটার কথা বলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, সিটি করপোরেশন পৃথক পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে থাকে অনিয়ম ও গাফিলতির নানা তথ্য। বিস্ফোরণের ঘটনায় তিতাস গ্যাস গঠিত তদন্ত কমিটি মসজিদের উত্তর পাশের সড়কের মাটি খুঁড়ে পরিত্যক্ত পাইপলাইনে ছয়টি ছিদ্র দেখতে পায়। ছিদ্র পাওয়ার পর সোমবার তিতাসের চার কর্মকর্তাসহ ৮ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

দগ্ধ আরও দুই জনের মৃত্যু : নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ আরও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন আ. আজিজ (৪০) ও মো. ফরিদ (৫০)। গতকাল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এই ঘটনায় দগ্ধ মোট ৩৭ জনের ৩৩ জনই মারা গেলেন।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, চিকিৎসাধীন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শনিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে আ. আজিজের মৃত্যু হয়। তার শরীরের ৪৭ শতাংশ দগ্ধ ছিল।

বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল জানান, বিস্ফোরণে শ্বাসনালিসহ ফরিদের শরীরের ৫০ শতাংশ দগ্ধ ছিল। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ (গতকাল) দুপুর দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

তিনি জানান, চিকিৎসাধীন আমজাদের ২৫%, রিফাতের ২২% মো. কেনানের ৩০% দগ্ধ রয়েছে। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

নিহত আ. আজিজের ভাতিজা রমজান হোসেন জানান, তার বাড়ি শরিয়তপুর নড়িয়া বদেরশ্বর বাজার এলাকায়। বাবার নাম মনু মিয়া। থাকতেন পশ্চিম তল্লায়। ২ সন্তানের জনক তিনি। মসজিদটির পাশেই তার লন্ড্রির দোকান রয়েছে। ঘটনার আগ মুহূর্তে তিনি দোকান থেকে নামাজ পড়তে যান মসজিদে এবং দুর্ঘটনার শিকার হন। এর পর থেকে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি ছিলেন।

নিহত ফরিদের ছোট ভাই মো. ফজলুল হক জানান, ফরিদের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায়। নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লায় ঘটনার আগের দিনই মেয়ে খাদিজার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন ফরিদ। ঘটনার রাতে এশার নামাজ পড়তে গেলে সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে দগ্ধ হন ৪ সন্তানের জনক ফরিদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত