করোনাভাইরাসের সংকটের কারণে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে চলেছে। গত এক বছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের আড়াই মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমন তথ্য মিলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা আগে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। এ হিসেবে এক বছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ২১ হাজার ১১০ কোটি টাকা। অবশ্য এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করেছে। গত আড়াই মাসে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ঋণ থেকে মোট ১৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এর ফলে চলতি জুলাই থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণগ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে সরকারের নিট ঋণগ্রহণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেও ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণের পরিমাণ বেশি ছিল। তবে রেমিট্যান্স ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ বাড়ায় এ সময়ে ব্যাংকঋণ কিছুটা পরিশোধ করেছে সরকার। ফলে গত এক মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কিছুটা কমেছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। তবে কভিড-১৯ মহামারীর কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস নামায় সংশোধিত বাজেটে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা ধরা হয়। অবশ্য মহামারী মোকাবিলায় গত অর্থবছরের শেষ চার মাসে (মার্চ থেকে জুন) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অবশ্য সরকারের নিট ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১ হাজার ৯০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
করোনাভাইরাসের কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১২ হাজার ৩৩৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। অথচ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৩৭৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে অর্থবছরের প্রথম মাসে লক্ষ্যের চেয়ে ৭ হাজার ৪৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা কম আদায় হয়েছে। রাজস্ব কম আদায় হওয়ার কারণেই সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ করতে হচ্ছে। তবে নগদ সহায়তার কারণে প্রবাসী আয় বাড়ায় ব্যাংকঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কমেছে।
এদিকে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র থেকেও সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট ৮ হাজার ৪৮০ কোটি ৩১ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের জুলাই মাসের ৬ হাজার ৯১ কোটি টাকার চেয়ে ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে ট্রেজারি বিল থেকে ৬০ হাজার ৫২৩ কোটি ও ট্রেজারি বন্ড থেকে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে সরকারের। তবে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ফেরত দিয়েছে। ফলে এ সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। গত ১৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৩০ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ১৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার।
