জঙ্গি ও অপরাধীদের রুখতে এবার ইউনিয়ন পর্যায়ের লোকজনেরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। নির্দেশনা পেয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে। বছর চারেক আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ সব কটি মেট্রো এলাকা ও ৬৪ জেলার শহরাঞ্চলে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছিল জোরেশোরে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই কাজে ভাটা পড়ে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকেই নতুন করে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জোরালোভাবে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সব কটি মেট্রোপলিটন কমিশনার, ৬৪ জেলার এসপি ও দেশের সব থানার ওসিকে। এতে কোনো গাফিলতি থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ের লোকজনেরও তথ্য সংগ্রহ করে রাখা হবে। তথ্যগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সফটওয়্যারের আওতায় চলে আসবে। কেউ যদি জঙ্গি সংগঠন বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তা সহজেই পাওয়া যাবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। উন্নত দেশগুলোতে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে কেউ যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে বলা হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, বছর চারেক আগে সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস) নামের একটি সফটওয়্যারে নাগরিকের তথ্য যুক্ত করার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী দেশের সব থানা, ফাঁড়ি, তদন্তকেন্দ্র ও বিট পুলিশের সদস্যরা কাজ করেছেন। রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ সুপার এবং মহানগর এলাকায় কমিশনার ও উপকমিশনাররা এসব কাজের তদারকি করেছেন। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) নাগরিক তথ্য সংগ্রহের কাজ জোরদার করার উদ্যোগ নেয়। থানা পুলিশ বাড়ির মালিকদের কাছে এক পৃষ্ঠার ফরম পাঠিয়ে তাদের ভাড়াটেদের থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে বলে। এমনকি বাড়ির মালিকদেরও বলা হয়েছে তাদেরও ফরম পূরণ করতে হবে। ফরমে ছবির পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, ফোন নম্বর, জন্মতারিখসহ বাসার বাসিন্দা, গৃহকর্মী ও চালকদের তথ্য চাওয়া হয়। পরে সেই ফরম আবার সংগ্রহ করেন পুলিশ সদস্যরা। মালিকরাও থানায় দিয়ে আসেন। কিন্তু করোনার অজুহাতে পুলিশ আর তথ্য সংগ্রহ করছে না বলে অভিযোগ ওঠে।
গতকাল রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় গিয়েও অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। উত্তরা, খিলগাঁও, রামপুরা ও বনানী এলাকায় একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রায় ৬ মাস ধরে থানা পুলিশ বাড়ির মালিক বা ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহ করছে না। বাসা-বাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসছেন। কিন্তু তথ্য নেওয়া হচ্ছে না।
ডিএমপির কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভাড়াটে ও বাড়ির মালিকদের তথ্য সংগ্রহ করে সিআইএমএস সফটওয়্যারে রাখার জন্য পুলিশের সব ইউনিটকে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইউনিটগুলো নিজ এলাকার নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রথমে মেট্রোপলিটন এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যায়ক্রমে জেলা শহর, উপজেলা শহর ও অন্যান্য এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সফটওয়্যার অপরাধীদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কাজ করবে। তিনি বলেন, করোনার কারণে তথ্য সংগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহের কাজ জোরালো করা হচ্ছে। অপরাধীদের ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ডিএমপি সিআইএমএস সফটওয়্যার চালু করে। রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় এই সফটওয়্যারে নাগরিকের তথ্য যুক্ত করা হয়। কোনো এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হলে ওই এলাকার ওই বাসায় কোন লোক বসবাস করে ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আমরা তা সহজেই খুঁজে বের করতে পারি। শান্তিপ্রিয় মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাড়িওয়ালা, ভাড়াটে ও মেস সদস্যদের তথ্য নিবন্ধনের লক্ষ্যে প্রথম রমনা থানা থেকে সফটওয়্যারভিত্তিক ডাটাবেইসের কাজ শুরু হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের তথ্য একই সফটওয়্যারে আনা হচ্ছে। কেউ নতুন বাসা ভাড়া নিলে বা ঠিকানা পরিবর্তন করলে সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তির কর্মক্ষেত্র অন্য থানা এলাকায় হলে তার বাসা যে এলাকায়, সেই থানায় ফরম জমা দিতে হবে। কিন্তু এখন এসব হচ্ছে না বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা মন্ত্রিসভার বৈঠকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করার জন্য তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের ভাটা পড়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে। শহরের পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের লোকজনের তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। একই কথা বলেছেন কয়েকজন পুলিশ সুপারও। তারা বলেন, দেশের স্বার্থে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। আমাদের কাছে তথ্য এসেছে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে অপরাধীদের আনাগোনা থাকে। এ জন্য ইউনিয়নের লোকজনের তথ্য সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
