বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাজার মনিটরিংয়ের ওপর জোর দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কমলেও দেশি পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছে না। এজন্য পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে সফরে যাচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্য কর্মকর্তারা। এর অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার তিন জেলা সফরে গেছে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন একটি পর্যবেক্ষক দল। দু’দিনের এ সফরে তারা স্থানীয় প্রশাসন,
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলবেন। এদিকে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। ফলে ট্রাকেই পচে নষ্ট হচ্ছে পেঁয়াাজ। তবে দ্রুত এর সুরাহা হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দু’দিনে রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা সফর করবেন বাণিজ্য সচিব। এ বিষয়ে গতকাল জাফর উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানি করা পেঁয়াজের পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে চায় সরকার। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে। আমরা কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে চাই, যেকোনো অবস্থাতেই সরকার তাদের পাশে রয়েছে। পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আপাতত দেশি পেঁয়াজ দিয়েই যেন একটা মৌসুম পার করা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে আস্তে আস্তে পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে।’
এর আগে দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলার মধ্যে ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ী, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ অন্যান্য জেলার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশেষ করে পেঁয়াজ সরবরাহ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের সমস্যা না থাকে, সে বিষয়ে মনিটরিং জোরদার করার জন্য ডিসিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া পরিস্থিতি পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তিনজন যুগ্ম সচিবকে ওইসব জেলায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ভারত থেকে আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে প্রতিটি বন্দরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে পেঁয়াজের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এসআরও আজকে (মঙ্গলবার) জারি হবে বলে জানা গেছে। গত রবিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং শেষে আদেশটি এনবিআরে এসেছে। কাল (আজ) দুপুরের মধ্যে প্রেসে যাবে। এরপর সার্কুলার জারি করা হবে।
অন্যদিকে ভারতে আটকে থাকা ট্রাকভর্তি পেঁয়াজ দেশে আনার জটিলতা কাটেনি। গতকালও বেশ কয়েকটি বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আসেনি। তবে ব্যবসায়ীদের আশা, এই জটিলতা কেটে যাবে। তবে দ্রুত সময়ে পেঁয়াজ আনতে না পারলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। এনেও কোনো লাভ হবে না। ইতিমধ্যে পেঁয়াজ পচতে শুরু করেছে বলে ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা।
হাকিমপুর (দিনাজপুর) : দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গত শনিবার এলসি করা ১১টি ট্রাকে ২৪৬ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছে ভারত। এসব পেঁয়াজের বেশিরভাগই পচা বা নষ্ট। এতে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকরা। কিছু পেঁয়াজ বাছাই করে ভালো দামে বিক্রি করতে পারলেও অনেক পেঁয়াজ ফেলে দিতে হচ্ছে। কিছু পেঁয়াজ ১০০-২০০ টাকা বস্তা হিসেবে বিক্রি করলেও ক্রেতা নেই। এদিকে রবিবার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের ফলে আবারও বাড়তে শুরু করেছে দাম। গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে কোনো পেঁয়াজ আসেনি।
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক বাবলুর রহমান বলেন, ‘আমরা বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছিলাম, অনেক পেঁয়াজ (ট্রাকে) লোড হয়ে দেশে প্রবেশের অপেক্ষায় ছিল। হঠাৎ ভারত সরকার গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। আমরা আশায় ছিলাম শুক্রবারে নোটিফিকেশন জারি হবে, আটকে থাকা পেঁয়াজ রপ্তানির অনুমতি দেবে। কিন্তু তারা চালাকি করে মাত্র ১১ ট্রাক পেঁয়াজ রপ্তানি করেছে।’
হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি হারুন উর রশীদ বলেন, ‘অধিকাংশ পেঁয়াজই বেশ কয়েক দিন আটকে থাকার কারণে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু কিছু পেঁয়াজ প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ১০০-২০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। পেঁয়াজগুলো যদি দু-এক দিনের মধ্যে রপ্তানি করে তাহলে এর ৭৫ শতাংশের বেশি পেঁয়াজ নষ্ট হতে পারে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : সোনামসজিদ স্থলবন্দরের বিপরীতে ভারতের মহদিপুর বন্দরে আটকে পড়া দুই শতাধিক ট্রাকের পেঁয়াজে পচন ধরেছে। এ স্থলবন্দরের আমদানিকারক বাবুল হাসনাত দুরুল জানান, মহদিপুরে ২০০ থেকে ২৫০ পেঁয়াজবাহী ট্রাক আটকে পড়ে। আগের খোলা এলসির (ঋণপত্রের) পেঁয়াজ বাংলাদেশে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে গত শনিবার মাত্র ৮টি ট্রাকে ২১৩ মেট্রিক পেঁয়াজ সোনামসজিদ বন্দরে প্রবেশ করে। পরে আবার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ।
সাতক্ষীরা : ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে গতকাল চার ট্রাক পেঁয়াজ এসেছে। সীমান্তের ওপারে ভারতের ঘোজাডাঙ্গায় অপেক্ষায় রয়েছে আরও দুই শতাধিক পেঁয়াজভর্তি ট্রাক। বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, ‘গত শনিবার ৩১টি ট্রাক, রবিবার ৫টি ট্রাক ও সোমবার সন্ধ্যায় ৪টি ট্রাক দেশে আসে। এর মাধ্যমে ৪০ ট্রাকে ১ হাজার টন পেঁয়াজ ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে। বাকি পেঁয়াজ রপ্তানির জন্য প্রস্তুতি থাকলেও আসেনি।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন হাকিমপুর প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম খোকন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি শহীদুল হুদা অলক, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন)
