খাদ্য নিয়ে রাজনীতি নতুন নয়। সম্ভবত এর সূচনা সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা দখলের সময় থেকেই। ১৭৫৭ সালে পলাশীতে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়েই অনুপ্রবেশ ঘটে ব্রিটিশের বেনিয়া শাসনের। একেবারে শুরুতেই হাভাতের মতোই কোম্পানি লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপরও তারা হাত বাড়ায়। মুঘল আমলে বা পক্ষান্তরে নবাবি আমলে শায়েস্তা খাঁর সময় টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। এটার সত্যতা ঐতিহাসিকরা কেউ কেউ স্বীকার করেছেন। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য ঢাকায় শহর চৌধুরী বলে একটি সম্মানিত পদ ছিল। পদটি অনেকটা ইউরোপিয়ান ধাঁচের শেরিফের মতো। তার কাজটি ছিল তিনি সকালবেলায় বাজারে এসে দ্রব্যমূল্যের দাম ঘোষণা করতেন। বিক্রেতা ও ক্রেতা এই মূল্য মেনে চলতেন। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের বাজারে তো বটেই ঢাকার মসলিনসহ অন্যান্য কাপড়ের ওপর আগে থেকেই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের নজর পড়েছে। তাই পারলে সেগুলো তারা বিনামূল্যে কিনে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়। কালক্রমে সবকিছুর ওপরই ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়। পণ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ফলে দেশীয় পণ্য উৎপাদক, মহাজন, ব্যবসায়ী সবাই অক্ষম ও হতাশ হয়ে পড়ে। হাটবাজার, আড়ত সর্বত্র ব্রিটিশের উপস্থিতির ফলে বাজার বেসামাল হয়ে পড়ল। টাকার এক মণ চাল তখনো পাওয়া গেলেও তা নেমে আসে টাকায় ছয় সের চালে। এই দামে সাধারণ মানুষের পক্ষে চাল কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেজন্য ১৭৭০ সাল থেকে এক দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। অবস্থা এমন একপর্যায়ে চলে যায় যে, মানুষ ঘরবাড়ি এমনকি পরিবার পরিজনকেও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। উৎপাদন সবক্ষেত্রে কমে আসে।
মুঘল বাদশাহরা খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদনের বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। তারা পাঞ্জাব অঞ্চলে নিজস্ব উদ্যোগে একটা সেচব্যবস্থা চালু করেছিলেন। ফলে পাঞ্জাবে গমের উৎপাদনে কোনো ঘাটতি হয়নি। ব্রিটিশরা ক্রমান্বয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে ওই সব অঞ্চলে এ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ১৭৭০ থেকে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষে বাংলা-বিহার-ওড়িশার তিন কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক কোটি মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে।
প্রায় দুই শতাব্দী পর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে আবার খাদ্যের কৃত্রিম সংকটে, বিপুলসংখ্যক মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। অথচ সে বছর সবচেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদন হয়েছিল। এবার ব্রিটিশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দেশীয় ফড়িয়া, মহাজন ও বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী। দেশ বিভাগের পরও ওই ব্যবসায়ীরা থেকে গেল। কারণে-অকারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর অভ্যাসটা তাদের রয়েই গেল। সামরিক শাসনের আগে আগে তারা হঠাৎ করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়। ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের আগে তা-ই হয়েছিল। ফলে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আইয়ুব খান একজন ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একই চিত্র। বাজারে সব পণ্যের সংকট। শিশুখাদ্যের মহাসংকট। যেসব ক্ষেত্রে সংকট হওয়ার কথা নয়, সেসব ক্ষেত্রেও মহাসংকট। ছুতো একটাই যুদ্ধের ফলে সবক্ষেত্রে আমদানি কমে গেছে। সে সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ না থাকলেও কায়ক্লেশে আমদানির ব্যবস্থা করতে হলো। রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসায়ীদের একটা বড় অস্ত্র দাঁড়িয়ে গেল দ্রব্যমূল্য। দ্রব্যমূল্যের এই অস্ত্রের ব্যবহার আজও আছে। শুধু তাই নয়, কূটনীতির ক্ষেত্রেও খাদ্যদ্রব্য একটা বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেঁয়াজ একটি বড় কূটনীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পেঁয়াজ, ভারতীয় পেঁয়াজ, মিয়ানমারের, চীনের, মিসরের সব দেশের পেঁয়াজের স্বাদ আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে। কিন্তু অতীতে পেঁয়াজের বিষয়টি এত উচ্চারিত হতে শুনিনি। তার মানে রপ্তানিকারকরা বুঝে গেছে বাংলাদেশের মানুষ এতই পেঁয়াজপ্রেমী যে, এটাতেই দেশটাকে একটা চাপের মুখে রাখার শ্রেষ্ঠ উপায়। শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, আমদানির সব ক্ষেত্রেই আমরা একটা আমদানিনির্ভর দেশে দাঁড়িয়ে গেছি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর আসন্ন অথচ আমরা একটা অটোমোবাইলের কারখানা করতে পারলাম না। বিপুল পরিমাণ গাড়ি প্রতিদিন রাস্তায় নামছে, তার সবই আমদানি করা রিকন্ডিশন্ড।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর চট্টগ্রামের প্রগতিতে ভসকস নামে একটা গাড়ি পাওয়া যেত, বাস-ট্রাকও তৈরি হতে শুরু হলো। কিন্তু দেখা গেল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও রাজনৈতিক কারণে আশির দশকের গোড়াতেই সেসব বিক্রি হয়ে গেল। জাপান ও ভারত অটোমোবাইলে একচেটিয়া রপ্তানিকারক হয়ে গেল। ১৯৭২ সালে ভারত রেলের ব্যাপারে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল, হলো না। রেলের যেসব কারখানা ছিল তাও ধসে পড়ল। রেল একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। আঠারো কোটি মানুষের দেশে রেল ছাড়া হয়? যে ভারত বা জাপান আমাদের দেশে বাস-ট্রাক গাড়ি রপ্তানি করছে, তাদের দেশে রেলের অবস্থা কী? এখানেও ব্যবসায়ীদের দাপট। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ শুধু নয়, প্রভাব কাজ করছে প্রতি ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক নেতারা এসব প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সামনে অসহায় হয়ে পড়ছেন। গত কয়েক বছরে রেলের উন্নতি হওয়া শুরু হয়েছে বটে কিন্তু আমদানি করা ইঞ্জিন ও বগির মান নিম্নগামী। আর এখনইবা আমরা ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করব কেন? ইলেকট্রিক ট্র্যাক হতে বাধা কোথায়? বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি হলে ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করে আমরা প্রাচীন একটা জায়গায় পড়ে থাকব আর প্রতিবেশীরা উত্তরোত্তর আধুনিক রেলব্যবস্থা ব্যবহার করবে।
এবারে আসি খাদ্যদ্রব্যে। সবক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ফড়িয়া-মহাজনরা শাকসবজির দামও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষক দাম পাচ্ছেন না কিন্তু ফড়িয়া-মহাজন, চাঁদাবাজ ও পুলিশ পেয়ে যাচ্ছে। সবকিছুই ঘাড়ে পড়ছে মধ্যবিত্তের। উচ্চবিত্তের উপার্জন হিসাব ছাড়া, শাসকগোষ্ঠীর বাজারের বালাই নেই। তাদের পরিবারে সব জায়গার শ্রেষ্ঠ পণ্যটাই পৌঁছে যায়। দিনাজপুরের চাল, হাওরের পদ্মার বা যমুনার মাছের বড় বড় পেটি তাদের খাবার টেবিলে শোভা পায়। দেশে ভোক্তা অধিকার সংস্থা বলে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, সেও একেবারে ব্রিটিশের বলগাহীন মুনাফাকালে যেমন শহর চৌধুরী অসহায় হয়েছিলেন, তেমনি অবস্থায় আছে। একটা বিষয় স্বাধীনতার পর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ব্যবসায়ীদের মতো কোনো দেশপ্রেমের ছিটেফোঁটাও নেই। মুনাফা সে যেভাবেই হোক করতে হবে। দেশ ও জনগণের স্বার্থ দেখার বালাই একেবারেই নেই।
ব্রিটিশ আমলে যা হয়েছিল তাই এখন হচ্ছে অর্থাৎ উৎপাদনকারীর সঙ্গে যুক্ত কৃষক, তাঁতি, জেলেসহ সবার মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে। পেশা পরিবর্তন করছে। কৃষিশ্রমিক আজকাল পাওয়া যায় না। সবাই শহরে এসে কলকারখানায় কাজ খুঁজছে, নিদেনপক্ষে রিকশা চালাচ্ছে। করোনাকালে অনেকেই ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। সেখানেও জীবিকার ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশেও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। সেই প্রবৃদ্ধি বাড়ার সুফল কি ওই মেরুদণ্ড ভাঙা কৃষকরা পাচ্ছেন? অথচ এবারে করোনা মহামারীকালে কৃষকই আমাদের বাঁচিয়ে ছিলেন। একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ঔপনিবেশিককালের জাঁতাকলে পিষ্ট জনতাকে মুক্তি দেওয়া। ব্রিটিশের খারাপ কাজগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকিয়ে দেওয়া; লুণ্ঠন, দুর্নীতি এসব করে তারা কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছে স্বদেশে। ব্রিটেনে ভারতফেরত এই ধনাঢ্য লুটেরাদের বলা হতো নবাব। একই পদ্ধতিতে লুণ্ঠন করে বর্তমানে বাংলাদেশের যেসব নবাব বা রাজপুত্র মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকায় সেকেন্ড হোম করছে, তাদেরও প্রতিহত করা প্রয়োজন শুধু নয়, জরুরিও বটে।
লেখক নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতা
