শ্রবণশক্তির যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে আমরা বরাবরই উদাসীন। কানে একেবারেই শুনতে না পাওয়া বা অপেক্ষাকৃত কম শুনতে পাওয়াকে বলা হয় শ্রুতিক্ষীণতা বা বধিরতা। বধিরতা নিয়ে সবাইকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে ২৬ সেপ্টেম্বরকে বধিরতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
কারণ
কনডাকটিভ, সেনসরিনিউরাল, মিক্সড ও সাইকোজেনিক এই চার ধরনের হতে পারে বধিরতা। বহিঃকর্ণ ও মধ্যকর্ণের সমস্যায় হয় কনডাকটিভ ধরনের বধিরতা এবং অন্তঃকর্ণ, অডিটরি নার্ভ বা মস্তিষ্কের সমস্যা সেনসরিনিউরাল বধিরতার জন্য দায়ী। বংশগত কারণেও বধিরতা হতে পারে। এ ছাড়া প্রসবকালীন জটিলতা যেমন কম ওজন, প্রিম্যাচিউরিটি, বার্থ এসফেক্সিয়া, নবজাতকের জন্ডিসের কারণেও বধিরতা হতে পারে। পাশাপাশি বধিরতার জন্য দায়ী মায়ের গর্ভকালীন কিছু সংক্রমণ। যেমন সাইটোমেগালোভাইরাস, রুবেলাভাইরাস ইত্যাদি। এসব কারণে অল্প বয়সেই বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে জন্মগত বধিরতা দেখা দিতে পারে। শিশুর মেনিনজাইটিস, মাম্পস, মিশেলস, মধ্যকর্ণের সংক্রমণেও শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। পরিণত কিংবা বৃদ্ধ বয়সে আঘাতজনিত সমস্যা, উচ্চৈঃশব্দ, যেমন হেডসেট বা হেডফোনের বেশি ভলিউম, লাউডস্পিকারের শব্দ এবং আতশবাজির শব্দ, যানবাহনের উচ্চমাত্রার হর্ন বাজানো বা কল-কারাখানার প্রতিনিয়ত শব্দের কারণে বধিরতা দেখা যায়। তদুপরি কানের জন্য ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার এবং কানের অন্যান্য বিভিন্ন অসুখও শ্রবণশক্তি হ্রাসের বিশেষ কারণ।
প্রভাব
বধিরতার কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার শ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন। এ ছাড়া প্রায় ৯.৬ শতাংশ মানুষ শ্রবণ প্রতিবন্ধী, যাদের দুই কানেই সমস্যা। জন্মগত বধিরতা যেমন বাক্শক্তি বিকাশে বাধা দেয়, তেমনি শ্রবণক্ষীণতা ও বধিরতা মানুষকে সমাজে অগ্রহণযোগ্য করে ফেলে। শিশুর ভাষা শিক্ষা, লেখাপড়া ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি অপরিহার্য।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে বধিরতা প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, শিশুদের শ্রবণক্ষমতা স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা, স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের বধিরতার বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা, হিয়ারিং ডিভাইস ও থেরাপি সহজলভ্য করা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং এর পাশাপাশি ওটোটক্সিক ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। সামান্য সচেতনতা যেমন উচ্চ আওয়াজে গান না শোনা, জোরে হর্ন না বাজানো, কর্মক্ষেত্রের শব্দদূষণের মাত্রা বেশি হলে
যথাযথ শব্দরোধকের ব্যবহার করা শ্রবণশক্তি হ্রাস প্রতিরোধ করতে পারে। অন্যদিকে যারা বধির, যথাযথ শ্রবণযন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তারাও নিজেদের সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারে।
পাশাপাশি কিছু পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। যেমন কানে কোনো কিছুই ঢোকানো যাবে না। এমনকি কান পরিষ্কার করার জন্য কাঠি, মুরগির পালক বা কটনবাড ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
খৈল জমে কান বন্ধ ভাব হলে বা কানের মধ্যে বাইরের কোনো বস্তু প্রবেশ করলে অপসারণ করতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কানে তেল বা অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।
কানে যাতে পানি না যায়, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।
