নিয়োগ দেয় মোটা অঙ্কের বেতনে। আরও থাকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব। কিন্তু এর সবই মুখে মুখে। কাজে যোগ দেওয়ার পর নিয়োগপত্র চাইলে নানা অজুহাতে করা হয় সময়ক্ষেপণ। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কাজ করে গেলেও কখনই নিয়োগপত্র পান না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ধীরে ধীরে বকেয়া বেতনের অঙ্ক বাড়তে থাকলে একসময় চাকরিচ্যুত করে বিতাড়িত করা হয় প্রতিষ্ঠান থেকে। এ চিত্র রাজধানীর মহাখালীর ডিওএইচএসের ধ্রুপদী টেকনো কনসোর্টিয়াম লিমিটেড (ডিটিসিএল) নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি প্রতিষ্ঠানের। গত বুধবার এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগ এনে শ্রম আদালতে মামলা করেছেন এক ভুক্তভোগী। তার নাম মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে রাহাদ রহমান।
শ্রম আদালতে মোস্তাফিজুরের করা মামলার বিবরণ অনুযায়ী, তিনি ২০১৩ সালের ১ নভেম্বর থেকে মহাখালীর নিউ ডিওএইচএসের ৩০ নম্বর রোডের ৪৩১ নম্বর বাড়ির সফটওয়্যার তৈরি প্রতিষ্ঠান ধ্রুপদী টেকনো কনসোর্টিয়াম লিমিটেডে ‘ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার মৌখিক চুক্তিতে চাকরিতে ঢোকার বেশ কিছুদিন পার হলেও তাকে কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাস পূর্ণাঙ্গ বেতন দেওয়ার পর মার্চ থেকে কোম্পানির আর্থিক দুরবস্থার কারণ দেখিয়ে ভবিষ্যতে প্রদান করবে বলে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা কেটে রাখা শুরু করে। বাকি ৫০ হাজার টাকা করে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দিতে থাকে। কেটে নেওয়া বেতন পাওয়ার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে অসংখ্যবার সরাসরি ও ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও কর্র্তৃপক্ষ তার ৭০ মাসের কেটে নেওয়া ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি। পাওনা টাকা দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করলে ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর কর্র্তৃপক্ষ কোনো কারণ ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করে।
মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছয় বছর চাকরিকালীন কোম্পানির পলিসি অনুযায়ী ইনক্রিমন্টে দেওয়া হয়, যার ফলে সবমিলে আমার মাসিক বেতন দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। আর বেতন থেকে ৩০ হাজার টাকা করে কেটে রেখে সর্বশেষ ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৮৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোস্তাফিজুর শুধু একাই নন, তার মতো ডিটিসিএলের প্রতারণার শিকার হয়েছেন আরও অন্তত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। যাদের কাউকে এক মাস, কাউকে দুই মাস, আবার কাউকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ না করেই চাকরিচ্যুত করা হয়। ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লার্জ ট্যাক্সপেয়ার ইউনিটের (এলটিইউ) প্রথম সারির তালিকাভুক্ত এ সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান। কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাসরিন আক্তার ও পরিচালক (অপারেশন) হিসেবে রয়েছেন মাহাদী হাসান। তবে আড়ালে থেকে প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে আসার কাজ করে থাকেন নাসরিন আক্তারের স্বামী কর কর্মকর্তা কমিশনার জাকির হোসেন। এ দম্পতির জিরাবো এলাকায় মুসলিম ফ্যাশন নামে গার্মেন্টস ও অদিতি কোচিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন নাসরিন আক্তার।
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসরিন আক্তার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই ছেলে (মোস্তাফিজুর) মামলা করে খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। কারণ ওর কাছে কোনো ডকুমেন্টস নেই। মৌখিকভাবে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার মাসিক বেতনে চাকরি দিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু করোনার কারণে প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো চলছিল না। তাই সব কর্মচারীর বেতন কমিয়ে দিয়েছি। তারটাও কমানো হয়েছিল। তাই বলে সেটা যে পরবর্তী সময়ে দেওয়া হবে এমন কোনো তথ্য প্রমাণ সে দেখাতে পারবে না।’
স্বামী জাকির হোসেনের সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি প্রকল্পের কাজ বাগানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নাসরিন আক্তার বলেন, ‘ও আগে কিছু কাজ এনেছিল। কিন্তু সমস্যা হওয়ায় এখন সে সরে এসেছে। এখন আর কাজটাজ আনে না।’
তবে ডিটিসিএলের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, কর কর্মকর্তা জাকির হোসেন তার প্রভাব খাটিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করে থাকেন তার স্ত্রীর নামে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকে এনবিআরের যেসব প্রকল্পের কাজ করেছে তার মধ্যে রয়েছেÑ ওয়েবসাইট নির্মাণ (এনবিআর ডট গভ ডট বিডি), ওয়েবসাইট নির্মাণ (এনবিআর ডট ইলার্নিং ডট গভ ডট বিডি), এসেট ম্যানেজমেন্ট, মডার্নাইজেশন অব ভ্যাট এবং কাস্টম বন্ড হাউজ অটোমেশন সফটওয়্যার।
জানা গেছে, ডিটিসিএল সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বড় প্রকল্পের কাজ নেওয়ার চেষ্টা করছে। রেলওয়ের ই-টিকেটং সফটওয়্যার তৈরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় তদবির শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া সরকারি অফিসের বিভিন্ন কেনাকাটা কিংবা আমদানির দরপত্রে অংশগ্রহণের জন্য এ প্রতিষ্ঠানটিকেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
দেশের সফটওয়্যার তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, কাজে সহায়তা ও সমস্যা নিষ্পন্ন করে থাকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশনস (বেসিস)। সংগঠনটির পরিচালক দিদারুল আলম সানি মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ খাত দক্ষতানির্ভর শিল্প হওয়ায় সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন লাখ ব্যক্তি কাজ করছেন। যার যার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই তাদের বেতন নির্ধারিত হয়ে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেতন নিয়ে প্রতারণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডিটিসিএল নামে প্রতিষ্ঠানটির এমপ্লয়ির সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি মৌখিকভাবে শুনেছি। আমাদের সমস্যা নিষ্পত্তিকরণ শাখায় লিখিত অভিযোগ দিলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে ডিটিসিএলের মতো একই চিত্র দেশের অধিকাংশ সফটওয়্যার ফার্মের। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামো গড়ে ওঠেনি। দক্ষ ও মেধাবী লোকজনকে চাকরি দেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষ কোনো নিয়োগপত্র দেয় না। যার ফলে প্রতারিত হয়ে এ সেক্টর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই। তাদের কেউ কেউ আবার দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে তিন হাজারের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে বেসিসের সদস্যভুক্ত কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে দেড় হাজারের মতো। বেসিসের সদস্য ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করার অনমুতি নেই। কিন্তু এ সংগঠনের সদস্য না হয়েও সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বেসিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এক দশকের বেশি সময় ধরে এ খাতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিও শুরু হয়েছে। অথচ এ খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৌখিক চুক্তিতে মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন না দিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বেসিসের সভাপতি আলমাস কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের জন্য চাকরিবিধি তৈরি করে বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক ওয়ার্কশপ পরিচালনা করা হয়েছে। নিয়োগ ও চাকরি ছাড়ার জন্য লিখিত কন্ট্রাক্ট মেনে চলার জন্য বলা হয়েছে। তারপরও এটি কেউ না মানলে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ কিছু করার নেই। সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। আদালত আমাদের নির্দেশনা দিলে তার সদস্যপদ বাতিল করতে পারি।’
