আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন উন্নয়ন ও নৌরুট সচল রাখতে চট্টগ্রাম-ঢাকা-আশুগঞ্জ নৌরুট খননের কাজ বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম-ঢাকা-আশুগঞ্জ নৌ করিডোরে ৯০০ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে নৌপথের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নৌবন্দর উন্নয়ন ও যাত্রী টার্মিনালসহ আনুষঙ্গিক উন্নয়ন করা হবে। বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রকল্পের সংশোধিত প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। মেয়াদও এক বছর বাড়ছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পটিতে ১৭২ কোটি ৮০ লাখ টাকা অর্থায়ন বাড়ছে বিশ্বব্যাংকের। ফলে বিশ্বব্যাংকের মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর ২৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরকারি অর্থায়ন কমে মোট সরকারি অর্থায়ন দাঁড়াচ্ছে ২৯৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
আগামীকাল মঙ্গলবার একনেক সভায় প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। গণভবন থেকে একনেক সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান উপস্থিত থাকবেন। অন্যদিকে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সচিবরা উপস্থিত থাকবে। বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন প্রকল্পের সংশোধিত প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ সরকারি অর্থায়ন কমলেও বিশ্বব্যাংকের ৬ শতাংশ ঋণ বাড়ছে। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুন মেয়াদে সম্পন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। একনেকে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
একনেকের কার্যপত্রে দেখা গেছে, এই নৌ করিডোর বরাবর ছয়টি স্থানে নৌযানসমূহের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে ষাটনল, চরভৌরবী, চাঁদপুর, মেহেন্দীগঞ্জে, সন্দীপ ও নলচিরা স্থানকে নির্বাচন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় চারটি প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হবে। পানগাঁও ও আশুগঞ্জ টার্মিনাল উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পের ১৫টি লঞ্চ ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে। ভৈরব বাজার, আলু বাজার, হিজলা, হরিণা, মজু চৌধুরী, ইলিশা (ভোলা) ভেদুরিয়া, লাহারহাট, বদ্দারহাট, দৌলতখাঁ, চেয়ারম্যান ঘাট, সন্দীপ, তজুমদ্দিন, মনপুরা এবং তমুরদ্দিনে ১৫টি লঞ্চ ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল এবং ভোলা জেলায় বাস্তবায়িত হবে।
কার্যপত্রে আরও দেখা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আশুগঞ্জ নৌপথের গভীরতা বৃদ্ধি, জেটি, ঘাট ও পন্টুন স্থাপন, বিভিন্ন স্থানে নৌবন্দর উন্নয়ন, যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ এবং সদরঘাট নৌ-টার্মিনালের ওপর চাপ কমাতে অত্যাধুনিক করে ঢাকায় শ্মশানঘাট যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এ টার্মিনাল নির্মাণ হলে সদরঘাটের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে। স্বল্প ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য সরবরাহ ও যোগাযোগের মাধ্যম হলো নৌপরিবহন। গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা-আশুগঞ্জ-চট্টগ্রাম নৌ করিডোর বাংলাদেশের প্রধান অভ্যন্তরীণ নৌ বাণিজ্যিক রুট, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ।
সংশোধনী প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ করিডোরের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় দুই লাখ যাত্রী চলাচল করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বছরব্যাপী ঢাকা-আশুগঞ্জ-চট্টগ্রাম নৌপথের নাব্য নিশ্চিতকরণ, করিডোরের উন্নয়ন এবং বিআইডব্লিউটিএ’র প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২০২৪ সালে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রুটে বরিশালসহ অন্যান্য রুটের সংযোগ রয়েছে। এ রুটের সঙ্গে সংযুক্ত নারায়ণগঞ্জ এবং বরিশাল যুক্ত হলে মোট নৌপথের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯০০ কিলোমিটারের কিছু ওপরে। দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ-পানগাঁও হয়ে ঢাকা-আশুগঞ্জ পর্যন্ত নৌরুটের দৈর্ঘ্য ৮৩৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৮০ কিলোমিটার অংশ হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। ডুবোচরের কারণে সন্দ্বীপের পশ্চিমে ভাসানচরের দক্ষিণে পানির গভীরতা কমে এসেছে আড়াই মিটার থেকে ছয় মিটারের মধ্যে। এই অংশ জাহাজ চলাচলে অনুপযুক্ত হয়ে পড়ায় গত বছর এপ্রিল মাসে রুট সরিয়ে নেওয়া হয় ভাসানচরের দক্ষিণে জেগে ওঠা ঠেঙ্গারচর নামে পরিচিতি পাওয়া আরও একটি নতুন চরের পরে, যা বর্তমান রুট থেকে তিন কিলোমিটার গভীর সমুদ্রের দিকে।
এ বিষয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামীমা নার্গিস বলেন, চলমান এ প্রকল্পটির কিছু অঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি ও কিছু অঙ্গে ব্যয় কমে যাওয়ার কারণে প্রকল্পটির সংশোধন প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষ হলে এ করিডরে পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথে অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাবে। সার্বিক দিক বিবেচনায় প্রকল্পটি সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।
