কুকুর অপসারণে নগর প্রকৃতির অঙ্গহানি

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৪৭ এএম

‘৩৩ হাজার বছর আগে যে নেকড়েরা মানুষের পাশাপাশি ঘুরে শিকার করত তাদেরই কেউ কেউ প্রথম মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। রয়েল ইনস্টিটিউশন অফ টেকনোলজি, সোলনা, সুইডেন-এর প্রফেসর স্যাভোলাইনিন কোষ গবেষণায় প্রকাশিত এক ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখান যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কুকুরদের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য অনেক বেশি এবং তাদের সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক গ্রে উলফ-এর সঙ্গে, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৩৩ হাজার বছর আগে কুকুরের খুব প্রাচীন একটি উৎস নির্দেশ করে।’  সূত্র দ্য টেলিগ্রাফ।

হাজার হাজার বছরের পুরনো সম্পর্ক ছিন্ন করে কুকুরকে নগর থেকে অপসারণ করা হবে একটি ধ্বংসাত্মক ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ।

১. আধুনিক নগর পরিকল্পনায় পথকুকুর : সভ্যতার ইতিহাস আমাদের দেখায়, যেখানে উচ্ছিষ্ট-খাদ্য এবং ঘনবসতি রয়েছে সেখানে নানা ধরনের প্রাণী থাকবেই। এর মধ্যে কুকুর অন্যতম এবং সহজে দৃশ্যমান। এই বিবেচনায় একটি শহরে পথকুকুরের সংখ্যার প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে সেই শহরে মানুষের ঘনত্ব, তাদের দ্বারা উৎপন্ন উচ্ছিষ্ট এবং সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর। উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোতে খাদ্যের জন্য কুকুরকে এখনো উচ্ছিষ্ট বা আবর্জনার স্তূপের কাছেই যেতে হয়। নাগরিকদের যত্রতত্র উচ্ছিষ্ট ফেলবার অভ্যাসও পথকুকুরকে খাবারের সংকুলান করে দেয়। শহরে কুকুরের এই খাদ্যাভ্যাস জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বহু জীবাণু ধ্বংসে সহায়তা করে। অথচ আবর্জনায় মুখ দেওয়ার কারণে আমরাই কুকুরকে অচ্ছুৎ ভাবি। আবার এমনটি ভাববার কোনো সুযোগ নেই যে, এদের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত না করেই রাতারাতি পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বাক্সবন্দি করলেই সব কুকুর চলে যাবে! এমনটি হবে না বরং এতে করে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। হঠাৎ সৃষ্ট খাদ্যসংকট এই কুকুরদের মাঝে অস্থিরতা বাড়াবে। নিজেদের মাঝে লড়াই করতে গিয়ে শহরের মানুষকেও আক্রান্ত করবে ও জলাতঙ্ক ঝুঁকি বাড়বে। কাজেই, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোতে কুকুরের সংখ্যা কমানোর রাতারাতি কোনো সমাধান নেই। এক্ষেত্রে আমরা পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের মধ্যবর্তী দেশ তুরস্কের দিকে তাকাতে পারি। সেখানকার শহরগুলোতে এক সময় পথকুকুর নিধন করা হতো। বিষপ্রয়োগ করে প্রতি বছর হাজার হাজার কুকুর মেরে ফেলা হতো ২০০৪ সাল পর্যন্ত। মিউনিসিপ্যালিটি থেকে বহু কুকুরকে আশপাশের জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসা  হতো যেমনটা আমাদের নগরের একাংশের কর্র্তৃপক্ষ চাইছেন। কিন্তু এর ফলাফল হয়েছিল আত্মঘাতী। ফেলে দিয়ে আসা কুকুরগুলো বেশি হিংস্রতা ও জলাতঙ্কের জন্য হুমকি হয়ে উঠল। ২০০৪ সালের পর তুর্কি সরকার নিধনের পরিবর্তে কুকুরদের নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেয়। ইস্তামবুল, আনকারা-সহ তুরস্কের অন্যান্য শহরে কুকুরদের বন্ধ্যত্বকরণ, কুকুর উদ্ধার করে চিকিৎসা প্রদান, কুকুরদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের সংস্থান করা এবং মানুষের মাঝে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে তুরস্কের শহরগুলোতে পথকুকুর ও মানুষের মাঝে মানবিক সহাবস্থান লক্ষণীয়। এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার দিকেও তাকাতে পারি আমরা। নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত, নাগরিকদের প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিবর্তন এবং কুকুরের বন্ধ্যত্বকরণ ও জলাতঙ্ক টীকা দানের মাধ্যমেই একটি সহনশীল সহাবস্থান সম্ভব। একই সঙ্গে শহরের গাছপালা, ফুটপাত ও পানির ব্যবস্থাপনাও শহরে পথকুকুরের শান্তভাবে বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

২. এলাকার কুকুর অথবা কুকুরের এলাকা : হাজার হাজার বছর ধরে কুকুরের নিজস্ব দল এবং সেই দলের সঙ্গে মানবগোষ্ঠীর সম্পর্ক কুকুরকে ‘টেরিটোরিয়াল’ বা স্থানিক করেছে। এই টেরিটোরিয়াল আচরণের কারণে কুকুরেরা তাদের সীমানায় কোনো আগন্তুক অথবা অন্য কোনো প্রাণী এমনকি কুকুর এলেও বাধা দিত। ফলে মানুষ কুকুরগুলোকে নিজের গোষ্ঠীর সদস্য মনে করত এবং অপরদিকে কুকুরগুলোও সেই গোষ্ঠীকে নিজের দল ভাবতে শুরু করল। এই একই স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য শহরে ঘুরে বেড়ানো পথকুকুরদের মাঝেও দেখা যায়। কুকুরগুলো বিভিন্ন এলাকা, গলি অথবা রাস্তাকে নিজের টেরিটোরি বানিয়ে অবস্থান নেয়। নিজের টেরিটোরির প্রতিটি মানুষকে তারা চিনে রাখে। এক একটি এলাকার কুকুরগুলো নিজ এলাকার মানুষের আনাগোনার সময় সম্পর্কেও ধারণা রাখে। অপরিচিত কেউ টেরিটোরির ভেতর প্রবেশ করলেই সে তার হাজার বছরের স্বভাব অনুযায়ী চিৎকার করে সতর্ক করে দেয়। কুকুরগুলো সারা রাত শহরের রাস্তায় হেঁটে বেড়ায় বলে ম্যানহোলের ভেতর থাকা লাখ লাখ ইঁদুর শহরে বেরিয়ে এসে অন্যান্য মহামারী রোগ ছড়াতে পারে না।

৩. অপসারণ পদ্ধতি ও জনস্বাস্থ্য : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা সরকারের জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারা দেশে ২০১৯ সালে ৭০ শতাংশেরও বেশি কুকুরকে এক রাউন্ড জলাতঙ্ক-নিরোধী টীকা দিয়েছে। এখন অপসারণের ফলে শূন্য হয়ে যাওয়া স্থানগুলোতে পরবর্তী প্রজনন ঋতুতে টীকা না পাওয়া নতুন কুকুর প্রতিস্থাপিত হবে। বিজ্ঞান মতে, একটি এলাকার কমপক্ষে ৭০ শতাংশ কুকুর জলাতঙ্ক টীকা পেলে সেই এলাকাটিতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ সৃষ্টি হয়। কারণ বাকি ৩০ শতাংশ কুকুরকে তারা ঘিরে রাখে। ফলে এর মাঝে জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর থাকলেও, সেটি কয়েকদিনের মাঝেই মৃত্যুবরণ করে। অর্থাৎ এরপর এলাকার পরিচিত কুকুরগুলোকে নির্ভয়ে সহাবস্থানে রাখা যায়। অপসারণ বা নিধনের মতো পদ্ধতি এই পুরো ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। ঢাকার প্রকৃতি থেকে কুকুর অপসারণের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হলে প্রথমেই যে সমস্যাটি হবে তা হলো শুরুতেই সব বন্ধুভাবাপন্ন কুকুর অপসারিত হবে। কারণ, তাদের ধরা সহজ। কিছু কুকুর পালিয়ে যাবে এবং মানুষকে বিশ্বাস করাও ভুলে যাবে। এই পালিয়ে থাকা কুকুরগুলো জীবন বাঁচাতে অন্য এলাকায় প্রবেশ করবে। শুরু হবে অন্য এলাকার কুকুরের সঙ্গে কামড়া-কামড়ি। অথবা অন্য এলাকায় কুকুর বেড়ে গিয়ে সেখানকার ভারসাম্য নষ্ট হবে। খাদ্যসংকট দেখা দেবে এবং নাগরিকদের অভিযোগ বাড়তে থাকবে। অপরদিকে অপসারণ করে মাতুয়াইলে ফেলে আসা কুকুরগুলো সেখানকার কুকুরদের সঙ্গে কামড়া-কামড়ি করবে। মাতুয়াইলের ‘ল্যান্ডফিল’-এ শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেন। ছোট ছোট শিশুরাও মায়ের সঙ্গে ‘ল্যান্ডফিল’-এ থাকে। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে এই শিশু ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। আপাতভাবে ‘ল্যান্ডফিল’-এ প্রচুর খাদ্যকণা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু সেখানকার বর্জ্যগুলো কয়েকদিনের পচাগলা মিশ্রণ, যার মাঝে প্লাস্টিকের পরিমাণই বেশি। এই ল্যান্ডফিলটি কোনো আবদ্ধ জায়গা নয় এবং এখানে কোনো ছাদ বা শেইড নেই। প্রতিটি প্রাণীই ঝড়বৃষ্টি থেকে আশ্রয় খোঁজে। এই আশ্রয় এবং মানুষের খাবারের উচ্ছিষ্ট খুঁজতে গিয়ে কুকুরগুলো ল্যান্ডফিলের পার্শ্ববর্তী মৃধাপাড়া, গোলাপবাগ, শনির আখড়া ইত্যাদি এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। অপসারণের ফলে ঢাকার ভেতর পালিয়ে থাকা কুকুরগুলো নিয়ে যে সমস্যা হবে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সমস্যা দেখা দেবে এইসব এলাকায়। কুকুরের কামড়ের সংখ্যা বেড়ে গেলে দেখা দেবে জলাতঙ্কের প্রকোপ।

৪. অপসারণ অকার্যকর ও মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তরায় : অপসারণ পন্থায় চললে একটা সময় নগর কর্র্তৃপক্ষ নিজেরাই হাঁপিয়ে উঠবে। শুরুতে ভ্রান্ত অভিযোগকারীরা আনন্দিত হলেও, কিছুদিন পরেই তারা বুঝতে পারবেন এটি সম্পূর্ণ অকার্যকর। কারণ কিছুদিন পরেই পার্শ্ববর্তী এলাকার কুকুর চলে আসবে। মানুষ ধৈর্য হারাবে এবং সমূহ আশঙ্কা রয়েছে এরপর নিজেরাই ফিরে আসা কুকুরগুলোকে মেরে ফেলবে। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়া একটা সময় সারা দেশের অসহনশীল মানুষকে গণহারে প্রাণী হত্যায় ইন্ধন জোগাবে। আমরা বাংলাদেশের বহু জেলায় দেখেছি কীভাবে সাধারণ মানুষ বন্যপ্রাণী হত্যা করে উল্লাস করে। যে অমানবিক উপায়ে কুকুরের মতো বন্ধুভাবাপন্ন প্রাণীকে অপসারণ বা নিধন করা হয়, তা শিশুমনে এবং সংবেদনশীল মানুষকে আহত করে। একজন তরুণ বা শিশু সহিংসতার এই রূপ দেখে সহিংসতাকে মেনে নিতে শিখবে। শিশুটি হয়তো এরপর কোনো কুকুর দেখলে নিজেই তাকে মারতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্রে ড. হ্যারোল্ড হোভেলের এক গবেষণায় দেখা যায় প্রায় ৪৫-৯০ শতাংশ সিরিয়াল কিলার এবং মানুষ নির্যাতনকারীর শৈশবে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ঘটনা ছিল। অর্থাৎ একজন মানুষ হঠাৎ একদিনে সহিংস হতে পারে না, বরং মানবিকতা শিক্ষার মতোই সহিংসতা শিক্ষাও একটি দীর্ঘদিনের চর্চায় গড়ে ওঠে। আমাদের নগর

কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহিংসতা নাকি মানবিকতা শিক্ষা দেবে সেটা নির্ধারণ করা জরুরি।

৫. মূল সমস্যা ও সমাধান : কুকুর নিয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় একই রকম। প্রথমত জলাতঙ্ক একটি প্রধান সমস্যা। যার সমাধান সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেবে। দ্বিতীয় সমস্যা হলো কুকুরের সংখ্যা। এই সমস্যা কতটুকু তা নির্ভর করে একটি সুস্পষ্ট জরিপের ওপর। এই জরিপে উঠে আসতে হবে শহরের বিভিন্ন এলাকার অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, রাস্তাঘাটের ধরন এবং জনসংখ্যা ও কুকুরের সংখ্যার অনুপাত। সেই হিসাবেই উঠে আসবে কোন কোন এলাকায় বন্ধ্যত্বকরণ দরকার রয়েছে। সর্বশেষ সমস্যা হলো দৃষ্টিভঙ্গি। কুকুরে-মানুষে বৈরী আচরণ, শিশুদের আহত হওয়ার সংখ্যা এই সবকিছু নির্ভর করে কুকুর ও মানুষের মধ্যকার আচরণে। অর্থাৎ, জরিপে এটি উঠে আসবে যে, কোন এলাকার মানুষের মাঝে কুকুর নিয়ে কী ধরনের জ্ঞান রয়েছে, কুকুর বিষয়ে কী ধরনের আচরণগত চর্চা রয়েছে। পরিশেষে আমাদের বুঝতে হবে, যেটিকে সমস্যা মনে করছি সেই বিষয়ে আমাদের কোনো গবেষণা রয়েছে কি না। বিশেষজ্ঞ মতামত ও গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে টেকসই সমাধানে এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক স্থপতি ও প্রাণী অধিকারকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত