এমফিটামিন নামের মাদক পাচারচেষ্টায় ফেডেক্স, ইউনাইটেড এক্সপ্রেস ও নেপচুন ফ্রেইট লিমিটেড নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশের তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে পাচারকারী হোতাদের এখনো সন্ধান মেলেনি। তাদের পরিচয় শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে এমফিটামিন মাদক পাচারের চেষ্টায় তিনটি প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক যোগসাজশের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ৬ জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত রবিবার বাবুল নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
তারা আরও জানান, গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রায় ২৪ কোটি টাকা মূল্যমানের ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম এমফিটামিন মাদক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মেলবোর্নে পাঠানোর চেষ্টা করে একটি চক্র। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে ওই মাদকের চালান আটক করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ফেডেক্স ও ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিমানবন্দর থানায় মামলা করে। মামলাটির তদন্ত করছেন অধিদপ্তরের খিলগাঁও সার্কেলের পরিদর্শক ফজলুল হক।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পোশাক রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ মাদক পাচারের চেষ্টায় জড়িত ফেডেক্স ও তার এজেন্ট অফিস ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কারণ বিদেশে কোনো পণ্যের চালান পাঠানোর ক্ষেত্রে যেসব নিয়মকানুন মেনে চলার কথা, তারা তা মানেননি। পার্সেল পাঠানোর ক্ষেত্রে যেসব তথ্য ও প্রমাণ সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে তার কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি গ্রেপ্তার ওই কর্মকর্তাদের কাছে। প্রেরকের ঠিকানাও ভুয়া।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘জিন্স প্যান্ট ঘোষণা করে ৭টি কার্টনের আড়ালে বিপুল পরিমাণ এমফিটামিন পাচারচেষ্টায় জড়িত বাবুল নামে এক ব্রোকারকে রবিবার গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চক্রের হোতাদের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া রুবেল নামে আরও একজনকে আমরা খুঁজছি। যিনি ওই কার্টনগুলোর প্যাকেজিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাকে পাওয়া গেলে পুরো সিন্ডিকেটের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।’
অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোর উপপরিচালক আহসানুর রহমান বলেন, ‘এমফিটামিন পাচারচেষ্টায় আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত। প্রাথমিকভাবে কুরিয়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আরও একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যাদের ধরতে অভিযান চলছে। আশা করছি, শিগগিরই এই মাদক পাচারচেষ্টায় জড়িত হোতাদের শনাক্ত করতে পারব।’
বিমানবন্দর থানায় দায়ের ওই মামলার আসামিরা হলেন ফেডেক্সের নির্বাহী পরিচালক (হিসাব) খন্দকার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ (৫০), ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের জেনারেল ম্যানজোর (জিএম) গাজী মো. শামছুল আলম (৪০), মিরপুর সেনপাড়ার ৪২ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা রাসেল মাহমুদ (৩২), কাজল টি গোমেজ, কার্গো রপ্তানি ভিলেজের হেলপার মো. হামিদুল ইসলাম ও কাজী নজরুল ইসলাম। এ ছয়জনকে আদালতের অনুমতি নিয়ে কারাফটকে তিনদিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৫ সেপ্টেম্বর উত্তরার নেপচুন ফ্রেইট লিমিটেড থেকে জনৈক রুবেল নামে এক ব্যক্তি ৭টি কার্টন কুরিয়ারে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ‘জিন্স প্যান্ট’ ঘোষণা করে শামছুল আলমের উত্তরার ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের অফিসে আসেন। কার্টনগুলো অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে পাঠানোর জন্য বুক করা হয়। এরপর রাসেল মাহমুদ ও ফেডেক্সের নির্বাহী পরিচালক (হিসাব) খন্দকার ইমতিয়াজ কার্টনগুলো ফেডেক্সের মতিঝিল অফিস থেকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে শিপমেন্টের জন্য পৌঁছে দেন। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, উক্ত কার্টনগুলোর শিপমেন্টের জন্য কাজল, হামিদুল ও নজরুল কার্গো হেলপার হিসেবে সহায়তা করেন।
এমফিটামিন উদ্ধারের ঘটনায় গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আহসানুল জব্বার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এমফিটামিন মাদকের চালানটি পাচারের জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হয়। এতে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত থাকতে পারে। ওই সময় অধিদপ্তরের রাসায়নিক গবেষক ড. শফিক আহমেদ বলেছিলেন, ‘এমফিটামিন মাদক আমাদের দেশে জনপ্রিয়তা না পাওয়ায় কারবারিরা ইউরোপে পাচার করে থাকতে পারে। এগুলোর আনুমানিক দাম কেজিপ্রতি ২ কোটি টাকা।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দেশে যে ধরনের ইয়াবা আসে, সেগুলোর কাঁচামাল হিসেবে এমফিটামিন ব্যবহার হয়ে থাকে। উদ্ধার এমফিটামিন দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৩২ হাজার ইয়াবা তৈরি করা যেত।’
