ছোট হয়ে আসছে দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহখ্যাত কর্ণফুলী নদী। পলি জমতে জমতে নদীর বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে জেগে উঠছে চর। শিল্প ও আবাসিক বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে কর্ণফুলীর পানি। এর পাশাপাশি নদীর দুই তীর গিলে খাচ্ছে অবৈধ দখলদাররা। এ পরিস্থিতিতে নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীশাসন, নিয়মিত ড্রেজিং, দূষণ প্রতিরোধ ও নদীর দুই তীর অবৈধ দখলমুক্ত করার মাধ্যমে নদীর প্রকৃত প্রবাহ ফিরিয়ে আনা না গেলে কর্ণফুলীর ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
গত রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় শাহ আমানত সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চাক্তাই খালের মুখ থেকে শুরু করে কালুরঘাটের দিকে কর্ণফুলীর প্রায় অর্ধেকাংশ ভরাট হয়ে চর পড়েছে। শাহ আমানত সেতুর নিচে নদীর যে অংশটি দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে সেটিকে মনে হচ্ছিল বড় একটি খাল। ভাটার সময় চরে আটকে পড়া কয়েকটি নৌকা অনেক কসরত করে টেনে পানিতে নামাচ্ছিল মাঝি-মাল্লারা।
সেতুর কাছে দাঁড়ানোর ইছানগর এলাকার সাম্পান মাঝি আলী হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ জায়গায় কর্ণফুলীর অবস্থা এমন ছিল না। পিলার সেতু হওয়ার পর পলি জমতে জমতে এ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভরাট হওয়া পলি প্রয়োজনীয় ড্রেজিং করে না সরানোয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাণের এ নদী। এভাবে ভরাট হতে থাকলে সামনে হয়তো নদী পার হওয়ার জন্য আর নৌকা-সাম্পান লাগবে না। মানুষ হেঁটেই পার হয়ে যেতে পারবে।’
কর্ণফুলীর ভরাট হওয়া পলি খননে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ দুই দফা বড় ধরনের ড্রেজিং প্রকল্প (ক্যাপিটাল ড্রেজিং) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও নানা জটিলতায় তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। যে কারণে প্রতিদিন কর্ণফুলীতে পলির পরিমাণ বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় চীন থেকে একটি বিশালাকায় সাকশন ড্রেজার এনে খননকাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু নদীর তলদেশে জমে থাকা পলিথিনের কারণে ওই ড্রেজার দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তবে স্থানীয় ড্রেজার দিয়ে আমাদের নিয়মিত ড্রেজিং কাজ চলছে এবং ইতিমধ্যে পাঁচটি লাইটারেজ জেটির কাছে ড্রেজিং করে সেখানে জাহাজ ভেড়ানোর মতো অবস্থায় তৈরি করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর্ণফুলী রক্ষায় ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী তার স্বরূপ ফিরে পাবে বলে আশা করছি।’
সম্প্রতি কর্ণফুলী নদী নিয়ে করা চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা কমিটির এক জরিপ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে নদীটির ভরাট, দূষণ ও দখলের ভয়াবহ চিত্র। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে অর্ধেকের বেশি কমে গেছে কর্ণফুলী নদীর প্রশস্ততা। কর্ণফুলী সেতু নির্মাণের সময় এডিবির মাস্টার প্ল্যান ও বিএস সিট অনুযায়ী কর্ণফুলীর প্রস্থ ছিল ৮৮৬.১৬ মিটার। বর্তমানে শাহ আমানত সেতু (দ্বিতীয় কর্ণফুলী সেতু) পয়েন্টে কর্ণফুলীর প্রস্থ নেমে এসেছে মাত্র ৪১০ মিটারে। জরিপকারীরা নদী দখলের যে চিত্র তুলে এনেছে তাতে দেখা যায়, এডিবির মাস্টার প্ল্যানে শাহ আমানত সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে ফিরিঙ্গীবাজার পর্যন্ত যেখানে নদী হিসাবে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে সেখানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী ঘরবাড়ি ও মাছের আড়তসহ বিভিন্ন স্থাপনা। সেতুর কাছে রাজাখালী খালের সঙ্গেই রয়েছে বেড়া মার্কেট বস্তি। নদী দখল করে কাঁচা ঘর বানিয়ে সেখানে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কর্ণফুলী দখল করেই গড়ে তোলা হয়েছে সোনালি মৎস্য আড়ত ও মেরিন ফিশারিজ পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
কর্ণফুলী নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের চিহ্নিত করা ২ হাজার ১৮১টি স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের দেওয়া নির্দেশনায় উচ্ছেদের জন্য তিন মাস সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উচ্ছেদকাজ শুরু হয় আদালতের নির্দেশের তিন বছর পর। প্রথম দফায় মাত্র ১০ একর ভূমি উচ্ছেদের পর তা থমকে যায়। এরপর আর উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়নি।
চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদী দেশের অর্থনীতির প্রাণ। এ নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছাচারিতা, অদূরদর্শিতা ও অবহেলায় আজ কর্ণফুলী নদী খালে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যথাযথ নদীশাসন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া বড় ধরনের ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভরাট হতে থাকা পলি খনন করা না হলে কর্ণফুলীর প্রাণপ্রবাহ বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।’
