করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিগগির খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ভাবছে সরকার। গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে খুলে দেওয়া বা এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিসভা বা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এদিকে বন্ধ থাকা এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃপক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া অথবা এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনের আগে বিশেষজ্ঞদের পারমর্শ নিতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমন পরিস্থিতিতে সার্বিক বিষয়ে আগামীকাল বুধবার দেশের শিক্ষা সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজনও করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানানোর সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে বলেন, ‘আমরা বলে দিয়েছি, যেকোনো সেক্টরগুলো রেসপেকটিভ মিনিস্ট্রিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা কর্র্তৃপক্ষ তারা তাদের নিজ বিবেচনায় ব্যবস্থা নেবেন।’
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করার পর আমরা কনভে করে দিয়েছি। এরপরও তারা যদি মনে করে যে সাজেশন দরকার বা কোনো রুলিং দরকার মন্ত্রিসভার বা প্রধানমন্ত্রীর, আমাদের যদি রেফার করে তাহলে সেটা বিবেচনা করা হবে। কিন্তু এখন অথরিটি তাদের কাছেই দিয়ে দেওয়া আছে।
এদিকে এইচএসসি পরীক্ষার আয়োজন করা নিয়ে মন্ত্রণালয়কে তিনটি ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃপক্ষ। পরীক্ষা আয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবগুলো হলোÑ কেন্দ্র সংখ্যা বৃদ্ধি, সিলেবাস ও নম্বর কমানো এবং পরীক্ষার বিষয় কমিয়ে আনা। এছাড়া অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা নেওয়ার পরামর্শও রয়েছে। এ প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এইচএসসি পরীক্ষার আয়োজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া, শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃপক্ষের দেওয়া প্রস্তাবগুলোসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে দেশের শিক্ষা সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আগামীকাল বুধবার জুমের মাধ্যমে এ সভার আয়োজন হওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এমএ খায়ের।
প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান জানতে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে গতকাল ফোন করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, শিগগিরই প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ভাবা হচ্ছে। খুলে দেওয়ার নির্দেশনা হলেও কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া নিয়ে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা বেশ খানিকটা উদ্বিগ্ন রয়েছেন। কোনো অবস্থাতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠাতে চান না তারা। কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, দেশের করোনার প্রভাব তো এখনো কমেনি। শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকদেরও জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় ঝুঁকি নিতে চান না তারা।
এ বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সন্তানরা সুস্থ থাকলে, বেঁচে থাকলে পড়াশোনা অনেক করতে পারবে। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে স্কুল খুলে দিলে তারা যদি করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে এর দায়ভার কে নেবে? সরকারকেই নিতে হবে। ফলে আমরা মনে করি কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নিয়ে স্কুল খুলে দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক এবং শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ বিষয়ে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্কুল যখন বন্ধ হয়েছে একদিন তো খুলতেই হবে। দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন স্থবির হয়ে আছে। এটা স্বাভাবিক করার জন্য সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় খুবই চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেই স্কুলগুলো খুলে দেবে সরকার। করোনা পরিস্থিতি একটু একটু করে উন্নতিও হচ্ছে। কিন্তু খুলে দেওয়ার আগে অবশ্যই সরকার এবং মন্ত্রণালয়কে বারবার যাচাই-বাছাই করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন শীতে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এই কথার অবশ্যই ভিত্তি রয়েছে। শীতে হয়তো ইউরোপের দেশগুলোতে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে পারে। বাংলাদেশে কেমন হবে তা ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হবে। শিশুদের বেলায় কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না।’
স্কুল খুলে দিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে জানতে চাইল তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রতিষ্ঠাগুলো থেকে এটা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম অবস্থায় প্রতিদিন ক্লাস না নিয়ে সপ্তাহে তিন বা চার দিন ক্লাস নেওয়া যেতে পারে।’
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা আছে। গত ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে তা স্থগিত রয়েছে। বছর প্রায় শেষ হয়ে আসায় এ পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। মহামারীর কারণে এবার পঞ্চম ও অষ্টমের সমাপনী পরীক্ষা নেবে না সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে ওপরের শ্রেণিতে তোলার কথা রয়েছে।
