রিফাত হত্যা মামলার রায় আজ

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৭ এএম

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির সাজা হবে কি না তা জানা যাবে আজ বুধবার। বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামানের আদালতে আজ এ মামলার রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। দুপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি রায়ের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করে দেন।

১৫ মাস আগে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা ওই হত্যাকান্ডের পর পুলিশ যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছিল, তাদের মধ্যে ১০ জনের বিচার চলে জজ আদালতে। বাকি ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বরগুনার শিশু আদালতে আলাদাভাবে তাদের বিচার চলছে। ২০১৯ সালের ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে কিশোর গ্যাং ‘বন্ড বাহিনী’র সদস্যরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। পরদিন রিফাতের বাবা মো. আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার এক নম্বর আসামি রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩) বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। আর নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি (১৯) অভিযোগপত্রের সাত নম্বর আসামি, যার নাম প্রথমে এ মামলার এজাহারে ছিল এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে।

প্রাপ্তবয়স্ক বাকি আট আসামি হলো আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২), হাসান (১৯), মুসা (২২), রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০), সাগর (১৯) ও কামরুল হাসান সায়মুন (২১)। এদের মধ্যে মুসা পলাতক এবং মিন্নি জামিনে। বাকিরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। রিফাতের ওপর হামলার ছয় দিন পর গত ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় এ মামলার আলোচিত প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড।

মামলা তদন্তের একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নির ‘প্রেমের সম্পর্ক’ ও হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানান। এরপর মিন্নিকে মামলায় সাক্ষী থেকে আসামি করা হয়। রিফাত হত্যাকাণ্ডের ২০ দিন পর গত বছর ১৬ জুলাই মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। প্রধান সাক্ষী থেকে মিন্নি আসামি হয়ে যাওয়ায় মামলাটি মোড় নেয় অন্যদিকে। হত্যাকাণ্ডের দুই মাস ছয় দিন পর গত বছর ১ সেপ্টেম্বর আদালতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে বিভক্ত করে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। এদের মধ্যে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামি এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিচারিক কার্যক্রম শুরুর জন্য এ বছর ১ জানুয়ারি বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত চার্জ গঠন করে। পরে গত ৮ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলার ৭৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্নের মধ্য দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করে আদালত।

নিহত রিফাতের বাবা আ. হালিম দুলাল শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার আসামিদের বিচার কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই, যারা আমার ছেলের হত্যাকারী চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করেছে।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ভুবন চন্দ্র হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলাটি রাষ্ট্রপক্ষ সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করেছে। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে, যেভাবে সাক্ষী দেওয়া হয়েছে তাতে এ মামলায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।’

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাইমুল ইসলাম রাব্বি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক আমরা খ-ন করে আদালতে আসামিদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছি। আমরা আদালতে যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছি, তাতে এ মামলায় আসামিরা ন্যায়বিচার পাবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।’

মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘আমরা রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় শুরু থেকে বলে আসছি, মিন্নি নির্দোষ। রিফাত মৃত্যুর আগে যেসব কথা বলে গেছে, তাতে মিন্নি এ মামলার সাক্ষী। কিন্তু মিন্নিকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। আমরা তার পক্ষে আমাদের যুক্তিতর্ক ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে আসছি। আমরা আশা করি, মিন্নি এ মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হবে।’

যেসব অপরাধে অভিযুক্ত ১০ আসামি

রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।

রিফাত ফরাজী : প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে এক নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী বরগুনা পৌরসভার ধানসিঁড়ি সড়ক এলাকার দুলাল ফরাজীর বড় ছেলে। বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডের ডান হাত হিসেবে কাজ করত সে। রিফাত হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাসহ বাস্তবায়নে সরাসরি অংশ নেয় ফরাজী।

আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন : রাব্বি আকন কিশোর গ্যাং বন্ড গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। রিফাত হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি অংশ নেয় সে। রাব্বি আকন বরগুনা সদর উপজেলার কেওড়াবুনিয়া গ্রামের কালাম আকনের ছেলে।

মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত : সিফাত কিশোর গ্যাং বন্ড গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। রিফাত হত্যার দিন কলেজের মধ্যে হত্যা পরিকল্পনার সময় সে উপস্থিত ছিল। সিফাত বরগুনা পৌর শহরের কলেজিয়েট স্কুল রোডের মো. দেলোয়ার হোসেনের ছেলে।

মো. রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় : বন্ড বাহিনীর প্রধান নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল টিকটক হৃদয়। রিফাত হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অংশ নেয় সে। টিকটক হৃদয় বরগুনা পৌর শহরের কলেজ রোড এলাকার রফিক আলী খানের ছেলে।

মো. হাসান : রিফাত হত্যার সময় পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে মো. হাসান। হত্যা পরিকল্পনা অনুযায়ী নিহত রিফাত যাতে পালাতে না পারে সে বিষয়ে সে নজর রাখছিল। হাসান বরগুনা পৌর শহরের উপকণ্ঠের লাকুরতলা গ্রামের আয়নাল হকের ছেলে।

মো. মুসা ওরফে মুসা বন্ড : বন্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম মুসা। রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের অন্যতম প্রধান সহচর। রিফাত হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী এই মুসা। প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মধ্যে সেই একমাত্র এখনো পলাতক। মুসা বরগুনা পৌর শহরের ধানসিঁড়ি রোড এলাকার মো. কালাম খানের ছেলে।

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি : পুলিশের জমা দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী মিন্নি তার স্বামী রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনাকারী। মিন্নির পরিকল্পনায় নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।

রাফিউল ইসলাম রাব্বি : হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ না নিলেও বিষয়টি জেনেও আসামি মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাতকে আশ্রয় ও পালাতে সহযোগিতা করে রাব্বি। সে বরগুনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর ইউনিয়নের উরবুনিয়া গ্রামের মো. আ. রহমানের ছেলে।

মো. সাগর : হত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছে সাগর। এছাড়া হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সে অবগত ছিল। সাগর বরগুনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর ইউনিয়নের নলী মাইঠা গ্রামের মো. আবদুল লতিফ খানের ছেলে।

কামরুল ইসলাম সায়মুন : রিফাত হত্যার তিন আসামি নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রাব্বি আকনকে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগ তোলা হয়েছে সায়মুনের বিরুদ্ধে। সে বরগুনা পৌর শহরের ডিশ ব্যবসায়ী কাওসার আহমেদ লিটনের ছেলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত