চট্টগ্রামে বিগত দুই মাস ধরে চড়া সবজির বাজার। দুয়েকটি শীতের সবজি উঠলেও দরে নড়চড় নেই। গ্রীষ্মকালীন সবজিতেও বিরাজ করছে উত্তাপ। বিশেষ করে আলুর দামে আগুন, এক মাস ধরে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে।
এদিকে চট্টগ্রামের দোহাজারী-সাতকানিয়ার ক্ষেতে যে পটোল ২০ টাকা কেজি, নগরী ও উপজেলার খুচরা বাজারে তা গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। আবার আড়তের চেয়ে সব ধরনের সবজি খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। ক্ষেত থেকে সবজি গ্রাহক পর্যায়ে আসতে তিনগুণ দাম বাড়লেও বরাবরের মতো কৃষকের ভাগ্যে কিছুই জুটছে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা লুটে নিচ্ছে মুনাফা। কৃষক-ভোক্তারা ঠকলেও তদারকির কেউ নেই।
ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি সবজির জোগান দেন পটিয়া-দোহাজারী-সীতাকুন্ডের চাষিরা। সেখানকার ক্ষেতে যে টমেটো ৩৫ টাকা, নগরীর বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা আলু রেয়াজউদ্দিন বাজারের মোকামে ২৮ টাকা হলেও খুচরায় তা হয়ে যাচ্ছে ৪০ টাকা। ফলে নিম্ন আয়ের অধিকাংশ মানুষ সবজি কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কাঁচাপণ্যের বড় পাইকারি রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদার সবজি এনে বিক্রি করেন। তারা চড়া দাম পেলেও কৃষকের ভাগ্যে তা ছিটেফোঁটাও জোটে না। সাতকানিয়ার ধর্মপুরের সবজিচাষি মো. রুবেল বলেন, ‘২০ টাকা দরে ৩৫০ কেজি পটোল বিক্রি করলাম। আমার পাশের জমির চাষিও ২৫০ কেজি একই দরে বিক্রি করলেন। আমাদের মিষ্টি কুমড়োর দাম দিচ্ছে ১০ টাকা কেজি। অথচ শহরে এই পটোল ৬০ ও মিষ্টি কুমড়ো ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। দামের এত পার্থক্য কীভাবে সম্ভব, আমাদের বুঝে আসে না। এই দামের অর্ধেক পেলেও আমরা কৃষকরা বেঁচে যেতাম।’
সাতকানিয়ার খাগড়িয়া গ্রামের চাষি আবদুর রহমান বলেন, ‘একশ্রেণির ব্যবসায়ী আমাদের থেকে সব সবজি কিনে বিভিন্ন ধাপে কমিশন নিয়ে বিক্রি করেন। ফলে দাম তিন-চারগুণ বেড়ে যায়। বন্যার পানিতে আমার মতো অনেকের কিছু মরিচ ও বেগুন নষ্ট হয়েছে সত্যি। কিন্তু এ কারণে এসব পণ্যের দাম এত বেশি হওয়ার কথা নয়। সত্যিকার অর্থে সংকটে দাম বাড়লে আমাদেরও বেশি দাম পাওয়ার কথা।’
রেয়াজউদ্দিন বাজারের মেসার্স পটিয়া বাণিজ্যালয়ের কর্ণধার মোহাম্মদুল হক বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জ থেকে আলু আনতে ১৫ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া, কমিশনসহ অন্যান্য খরচের পরও আমরা ২৮-৩০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। খুচরা বিক্রেতারা ৪০ টাকা নিচ্ছেন।’ এবার আলুর দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘করোনাকালে ত্রাণ কার্যক্রমে প্রচুর লেগেছে। ফলে এখন সরবরাহের সংকট রয়েছে। তবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাজারে শীতকালীন সবজি আসবে। তখন দাম এমনিতেই কমে যাবে।’
রেয়াজউদ্দিন বাজারে আসা ক্রেতা বাপ্পা ভট্টাচার্য বলেন, ‘পাইকার থেকে খুচরা বাজারে দামের ব্যবধান কেজিতে ২০-৩০ টাকা। ব্যবসায়ীরা পকেট কাটলেও দেখার কেউ নেই। দাম নিয়ন্ত্রণের সরকারি অভিযান দরকার।’
গতকাল শুক্রবার সরেজমিন চট্টগ্রাম নগরীর বক্সিরহাট, সদরঘাট, সাবএরিয়া, চকবাজার, বৌবাজারসহ অন্যান্য বাজারে সব ধরনের সবজির দাম বেশি দেখা যায়। বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন আড়তে পটোল ও কাঁকরোল ৪০, মিষ্টি কুমড়ো ২৪ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। বেগুন ৬০, টমেটো ১০০, করলা ৬০ ও খুচরা বাজারে গাজর প্রতি কেজি ৯০ টাকায় বিক্রি হয়।
বক্সিরহাটের খুচরা সবজি বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যায় ফসলের ক্ষতি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কম। ক্ষেত থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে আমরাও বাড়তি দাম নিচ্ছি।’
রেয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক শিবলী বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সবজির সরবরাহ কম থাকায় দাম একটু বেশি। তবে খুচরা বিক্রেতারা রীতিমতো গলা কাটছেন। আগে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দিনে ৫০-৬০ ট্রাক সবজি এলেও এখন তা কমে ২০ ট্রাক হয়েছে। আর এরই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের অতিরিক্ত দাম নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নগরীর সব খুচরা বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ভোক্তাদের জিম্মি করে অধিক মুনাফা আদায়কারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
