মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল হবে কবে

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ১১:৪৭ পিএম

দক্ষিণের জেলা বরগুনা সাম্প্রতিক সময়ে দেশবাসীর আলোচনায় আছে চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের ঘটনায়। বহুল আলোচিত-সমালোচিত ওই হত্যাকান্ডের বিচারের খোঁজখবরও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। গত বুধবার রিফাত হত্যা মামলায় মিন্নিসহ প্রাপ্তবয়স্ক ছয় আসামিকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক বাকি ১৪ আসামির বিচার চলছে শিশু আদালতে। এই হত্যা মামলায় রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির একজন সাক্ষী থেকে আসামি হয়ে ওঠা এবং পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হওয়ার ঘটনা দেশবাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে। অথচ রিফাত হত্যাকান্ডের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল হত্যা মামলাটির প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড এবং তার নেতৃত্বাধীন ‘০০৭’ নামের কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ঘটনা। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ড নিহত হওয়ার পর থেকে বরগুনায় ইয়াবাসহ সর্বনাশা মাদকচক্র আর ক্ষমতার রাজনীতির মারপ্যাঁচ আড়ালে চলে গিয়ে সামনে চলে আসতে থাকে মামলাটির একের পর এক নাটকীয় মোড় পরিবর্তন। এখন পুলিশ বলছে নয়ন বন্ডের মৃত্যুর পর থেকে মাদকচক্র আর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে গেছে। কিন্তু দেশ রূপান্তরসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, কিশোর গ্যাংগুলোর দ্বারা চালানো মাদকচক্রের তৎপরতা তো কমেইনি বরং ভিন্ন নামে আরও সংগঠিতভাবে একচেটিয়া কারবার চালিয়ে যাচ্ছে এসব চক্রের হোতারা।

শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘নাম বদলে সক্রিয় বন্ড গ্যাং’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বরগুনায় মাদকচক্র ও কিশোর গ্যাংগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাটির বিচারে ছয়জনের মৃত্যুদন্ড ঘোষিত হলেও বরগুনায় এখনো সক্রিয় নয়ন বন্ডের ‘০০৭’ গ্রুপটি। তবে নাম পাল্টে এই গ্রুপটি এখন ‘টিম-৬১’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে ‘লারেলাপ্পা’ ও ‘হানিবন্ড’সহ আরও কিছু নামে বরগুনা শহরে সক্রিয় কয়েকটি কিশোর গ্যাং। গ্রুপ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘টিম-৬১’ গ্রুপটি যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলেও ‘লারেলাপ্পা’ গ্রুপটি ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক সেবনের গোপন গ্রুপ হিসেবে। আর হানিবন্ড নামের গ্রুপটি ব্যবহার করা হচ্ছে নারীদের মাদক সেবনের জন্য। এই গ্রুপের সদস্য হওয়ার জন্য তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয় গ্রুপ সদস্যদের। এগুলো হলো প্রথমত, অবশ্যই মাদকসেবী হতে হবে; দ্বিতীয়ত, মাদক কারবারে যুক্ত হতে হবে এবং তৃতীয়ত, বাহিনীর সদস্য হিসেবে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, লুটপাট, অপহরণ ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে হবে। এসব কিশোর গ্যাং সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। শুধু হাতেগোনা কয়েকজনের বয়স ৪০-এর বেশি। তবে বরগুনার পুলিশ প্রশাসনের দাবি, বর্তমানে বাস্তবে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই সেখানে।

উল্লেখ্য, বরগুনার আলোচিত এই রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা হয়েছিল নয়ন বন্ডের নেতৃত্বাধীন ‘০০৭’ মেসেঞ্জার গ্রুপটিতেই। এই মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট যে, রিফাত হত্যার অন্যতম কারণ এই মাদকচক্র ও কিশোর গ্যাং। সে সময় নয়ন বন্ডের মাদক-বাণিজ্য ও সন্ত্রাসী তৎপরতার নেপথ্যে বরগুনা আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতার কথাও উঠে আসে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, নয়ন বন্ড নিহত হওয়ার পর ওই মহলই এখন পুরো শহরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই মহল বরগুনার শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক ছড়িয়ে দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। এমনকি মাদকচক্রটি এখন ওয়ার্ড থেকে পাড়া-মহল্লায় ‘বিক্রয় প্রতিনিধি’ নিয়োগ দিয়েছে। আর এলাকাভিত্তিক ‘বড় ভাই’দের দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন হোতারা।

বরগুনায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদকচক্রের এমন তৎপরতার ভয়াবহ সাক্ষ্য মিলবে সেখানকার মাদক মামলাগুলোর তথ্যপ্রমাণে নজর দিলেই। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর সদরের নলটোনা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আবু সালেহকে ইয়াবাসহ আটক করে পুলিশ। গত কয়েক বছর ধরে বরগুনায় মাদক মামলার সংখ্যাও কম নয়। ২০১৪ সালে মাদকের মামলা হয়েছে ১২৯টি। পরের বছর ২৭২টি। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৫৫৩টি। আবার ২০১৭ সালে তা আরও বেড়ে হয়েছে ৭০৩টি। ২০১৮ সালে কিছুটা কমে হয়েছে ৬৯৪টি। ২০১৯ সালে তা আরও কমে হয়েছে ৪৭৯টি। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মামলা মাত্র ৭৯টি। এই বাস্তবতায় এটা অনুমান করা কঠিন নয় যে, রিফাত হত্যা মামলার বিচারে বরগুনায় যে স্বস্তি ফিরেছে সেটা সাময়িক। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদকচক্রের কারবার আর কিশোর গ্যাংগুলোকে নির্মূল করতে না পারলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এই সংকট মোকাবিলায় আরও কঠোর হওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত