সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘কৃষি খাত ও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর করোনার প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাত্র দেড় মাসে দেশের কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সরকার করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কৃষকদের মধ্যে ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতা ও অনাগ্রহের কারণে তা ভেস্তে যেতে বসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বারবার তাগিদ সত্ত্বেও সরকারি-বেসরকারি ছয়টি ব্যাংক গত পাঁচ মাসে এ খাতে কোনো ঋণই বিতরণ করেনি। অথচ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণের পুরোটাই যথাসময়ে পেয়ে গেছে।
করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে দেশের কৃষক ও কৃষি খাত। লকডাউন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকার কারণে কৃষক তার উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারেনি। উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলের একটি বড় অংশ মাঠে পচেই নষ্ট হয়ে যায়। অবশিষ্ট শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, দুধ, ডিম পানির দামে বিক্রি করে কৃষকের অর্থনৈতিক মেরুদ- একবারে ভেঙে গেছে। করোনার পরে আসে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। আম্পানে মৌসুমি ফল আম, কাঁঠাল ও লিচুর প্রচুর ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ২৮ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ও ২৭ হাজার হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ২ হাজার কোটি। তার পর পর তিন দফা বন্যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যায়। বন্যায় আউশ ধান, পাট, আখ, আমন ধানের চারা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বন্যায় ভেসে যায় পুকুরের মাছ। বিনষ্ট হয় ঘরবাড়ি, কৃষি যন্ত্রপাতি। টাকার অভাবে কৃষক পানির দামে বিক্রি করে দেয় গবাদিপশু ও গৃহপালিত হাঁস-মুরগি। এবারের তিন দফা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমির ফসল। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮১৪ হেক্টর। সব মিলিয়ে ৩৭ জেলায় বন্যায় ফসলের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৫১ জন।
করোনা, আম্পান ও বন্যায় ফসল হারিয়ে কৃষক সর্বস্বান্ত। তাদের হাতে নগদ অর্থ নেই। কী দিয়ে করবেন তারা ফসলের চাষ। এ সময়ে বাকিতে সার, বীজ ও কীটনাশক বিক্রি করছেন না ব্যবসায়ীরা। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও ধার-কর্জ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের যারা বিদেশে কর্মরত ছিলেন, তারাও কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। এ অবস্থাতে কৃষি খাতের উন্নয়নে কম সুদে ঋণ প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। তাই ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার স্বার্থে প্রণোদনার এই ঋণ কৃষকদের মধ্যে যথাসময়ে বিতরণ করে ব্যাংকগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, কৃষকের মহাসংকটে তাদের পাশে দাঁড়াবে এটাই দেশের সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা।
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে গত ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তহবিল গঠন করে ওই তহবিলসহ সব কৃষিঋণে কৃষকের জন্য সুদহার ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে। বাকি ৫ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কৃষি খাতের তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেয় ব্যাংকগুলোকে। কৃষি খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়, সেটির ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৮ মাস। এ তহবিলের আওতায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্ধারিত ১ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে সুদ হবে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ। এ সুদহার নতুন ও আগের উভয় গ্রাহকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ খাতে কোন ধরনের
কৃষক, কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে জড়িত উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ কী পরিমাণ ঋণ পাবেন এসব বিষয় উল্লেখ করে ব্যাংকগুলোকে গাইডলাইন প্রদান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কৃষি খাতের তহবিল থেকে এই ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, ঋণ বিতরণের বেঁধে দেওয়া সময় পার হয়ে গেলেও ব্যাংকগুলো এ তহবিল থেকে মাত্র ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে, যা মোট ঋণের মাত্র শতকরা ২৮ দশমিক ২৮ ভাগ। আর এই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে সারা দেশের ৪৬ হাজার ৮১৫ জন কৃষকের মধ্যে। অথচ দেশে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩ জন। বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা, ও বেসরকারি বাংলাদেশ কমার্স, ওয়ান, ইউনিয়ন, মধুমতি ও সীমান্ত ব্যাংক এ তহবিল থেকে কোনো ঋণ বিতরণ করেনি।
বাংলাদেশে বড় কৃষকের সংখ্যা মোট কৃষকের শতকরা ২ভাগ, মাঝারি ১৮ ভাগ এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা শতকরা ৮০ ভাগ। খাদ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বলছে, এনজিও, আত্মীয়স্বজন ও দাদন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে কৃষক ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ গ্রহণ করে। এইসব ঋণের সুদ ১৯ থেকে ৬৩ শতাংশ। তাহলে কৃষক বাঁচে কীভাবে? আর সরকারি কৃষি ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে যে ঋণ দেয় তা কৃষক খুব সামান্যই পায়। ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকের ব্যাংকের কৃষিঋণে প্রবেশাধিকার নেই। কৃষকের মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ আসে কৃষি ব্যাংক থেকে।
৩২ বছর চাকরি জীবনে হাজার হাজার কৃষকের সান্নিধ্যে ছিলাম। কোটি কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত ছিলাম। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি প্রকৃত কৃষকের ঋণ কোনো দিন অনাদায়ী থাকে না। কৃষিঋণ অনাদায়ের অন্য কারণগুলো হলো সঠিক কৃষক নির্বাচন না করা। সঠিক পরিমাণ জমিতে ফসল চাষ না করা, সময় মতো ফসলের যতœ না নেওয়া, পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়া ইত্যাদি।
বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে গত বছর বিশ্বের শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশের তৃতীয় স্থান অর্জনের গৌরব অর্জন করেছে। সবজি উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। আলু উৎপাদনে অষ্টম। গত পাঁচ বছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। এসব অর্জন অব্যাহত রাখতে হলেও কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রয়োজন কৃষকদের মধ্যে স্বল্পসুদে কৃষিঋণ বিতরণ। ইতিমধ্যে কৃষক আমন ধান রোপণের কাজ শেষ করেছে। বাতাসে দোল খাচ্ছে সবুজ ধানের চারা। এ বছর ৪৯ লাখ হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ মেট্রিক টন আমন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ১৪ লাখ টন বেশি। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সময়মতো আগাছা দমন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনের জন্য বালাইনাশক প্রয়োগ ও সম্পূরক সেচ প্রদান করতে হবে। এজন্য নগদ অর্থের প্রয়োজন। কৃষকের কাছে সেই নগদ অর্থ নেই। অন্যদিকে আমন ধান কাটার পর কৃষক ওই জমিতে গম, আলু ও ভুট্টার বীজ বুনবে। ডাল, তেলবীজ ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ করবে। শীতের সুস্বাদু সবজি ও আখ লাগাবে। এজন্যও প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এসব কর্মকান্ড সময় মতো সম্পাদনের জন্য কৃষিঋণ প্রণোদনার অর্থ সরকার বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে করোনা-উত্তর দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে কৃষি হতে পারে মূল চালিকাশক্তি। এ কারণে কৃষিঋণ প্রণোদনার শতভাগ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর
