‘নীরব ভোট বিপ্লব’। গতকাল সকাল থেকেই ভিড়ে ঠাসা সোনারগাঁও হোটেলের সবখানে ভাসছিল এই শব্দগুলো। ১২ বছরের গড়ে তোলা সৌধে কি তবে ফাটল ধরবে? মানুষ কি মুখ ফিরিয়ে নেবে কাজী সালাউদ্দিনের দিক থেকে? এমন অনেক কথাই হয়েছে। কিন্তু ভোটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। হেসেখেলেই চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সালাউদ্দিন। কাউন্সিলরদের অনেকে মুখে অনেক কথা বললেও শেষ পর্যন্ত ফুটবলের ভার তুলে দিয়েছেন তার হাতে। মোট ভোট পড়েছে ১৩৫টি। যার ৯৪টি পেয়েছেন সালাউদ্দিন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও ব্যালটে থেকে যাওয়া বাদল রায়ের পক্ষে জমা পড়েছিল ৪০ ভোট। আর এই পদে অপর প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মানিক পেয়েছেন এক ভোট।
সভাপতির মতো সিনিয়র সহ-সভাপতি পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার লেশমাত্র ছিল না। আগের তিনবারের সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদী পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ৯১ ভোট পেয়ে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমন্বয় পরিষদের নেতা শেখ মোহাম্মদ আসলাম পেয়েছেন ৪৪ ভোট। চার সহ-সভাপতি পদে সালাউদ্দিন নেতৃত্বাধীন পরিষদ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিন প্রার্থী। বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান পেয়েছেন সর্বোচ্চ ৮৯ ভোট। এরপর ৮১ ভোট পেয়েছেন কাজী নাবিল। নির্বাচনে নতুন মুখ আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭৫ ভোট পেয়ে চমক দেখিয়েছেন। চতুর্থ সর্বোচ্চ ৬৫টি করে ভোট পেয়েছেন সমন্বয় পরিষদের মহিউদ্দিন আহমেদ মহি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। চতুর্থ সহ-সভাপতি নির্ধারণে এই দুজনের মধ্যে হবে পুনর্নির্বাচন ৩১ অক্টোবর। ১৫টি নির্বাহী সদস্য পদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে সম্মিলিত পরিষদ। ৯টিতে জিতেছে এই পরিষদ। বাকি ৬টি পদে জিতেছেন সমন্বয় পরিষদের প্রার্থীরা।
বাফুফে নির্বাচনের সব রোমাঞ্চ জমা থাকে সভাপতি পদটি নিয়ে। এই পদে সালাউদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছিলেন বাদল রায় এবং শফিকুল ইসলাম মানিক। কিন্তু অসুস্থতার কারণে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন বাদল। নির্বাচন যত ঘনিয়েছে, বাদলের থাকা না থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। নির্বাচনের আগের রাতে নিজের ফেইসবুক পেজে নিজেকে সভাপতি করে একটি প্যানেল পোস্ট করেছিলেন বাদল। যদিও গতকাল এজিএমে উপস্থিত হননি তিনি। আগের রাতে বাদলের এই পোস্টে কাউন্সিলরদের মধ্যে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে ভোটের ফলে। সালাউদ্দিনের প্রতি মুখে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করলেও ব্যালটে ঠিকই তাকে বেছে নিয়েছেন। গত নির্বাচনে সালাউদ্দিন পেয়েছিলেন ৮৩ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী কামরুল আশরাফ খান পোটন পেয়েছিলেন ৫০ ভোট। সেই নির্বাচনে জিততে পোটন অর্থ থেকে শুরু করে অনেক প্রভাব খাটিয়েও পারেননি। আর বাদল এবার প্রচারণায় না নেমেই পেয়েছেন ৪০ ভোট। আর মানিককে নিয়ে পূর্বানুমানই সঠিক হয়েছে। তার ওপর আস্থা রেখেছেন মাত্র একজন কাউন্সিলর।
সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে সালামেই আস্থা রেখেছেন কাউন্সিলররা। বিগত ১২ বছর পেশাদার লিগ কমিটি ও ফাইনান্স কমিটির দায়িত্ব পালন করা সালামের ইমেজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল ভোটের আগে। আগের তিন নির্বাচনে সহজেই জয় পাওয়া সালামকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাবেন আসলাম এমনটাই অনুমান ছিল অনেকের। কিন্তু পরিবর্তনের পথে হাঁটেননি ভোটাররা। তাই ৪৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে আসলামকে ধরাশায়ী করেছেন সালাম।
চার সহ-সভাপতি পদে চমক দেখিয়েছেন বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান। ২০১৭ সালে ফুটবলে আবির্ভাবের পর থেকেই সাংগঠনিক দক্ষতার নানা নজির দেখিয়েছেন বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ এই কর্মকর্তা। তার কারণেই বসুন্ধরা কিংস এখন দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। নিজের দল ছাড়াও গত এক বছর বিভিন্ন ক্লাব ও জেলাকে নীরবে সহায়তা দিয়েছেন তিনি। যার ফলটা তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ ভোটে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়ে। গত নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া কাজী নাবিলকেও পেছনে ফেলেন তিনি। আবাহনীর ডাইরেক্টর ইন চার্জ অবশ্য এবারও জিতেছেন সহজেই। তবে একেবারে নতুন মুখ তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিকের তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়াটা একটা বড় চমক। চতুর্থ হওয়ার লড়াইয়ের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে মহি ও তাবিথকে। পুলিশ এফসির সভাপতি ৬১ ভোট পেয়েও এবারও হতাশ হয়েছেন। তবে সহ-সভাপতি লড়াই থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছেন ফুটবলে গত দুই দশকের আলোচিত মুখ আমিরুল ইসলাম বাবু (৫৬ ভোট পেয়ে আটজনের সপ্তম)। আগের চারটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হলেও সহ-সভাপতি পদে তার ওপর আস্থা রাখেননি ভোটাররা। ফলে ১৬ বছর পর বাফুফে থেকে ছিটকে গেলেন চরম শত্রু থেকে সালাউদ্দিনের একান্ত আস্থাভাজনে পরিণত হওয়া বাবু। এই পদে জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সমর্থন নিয়েও সুবিধা করতে পারেননি ময়মনসিংহ বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান (সর্বনি¤œ ৪৮ ভোট)।
১৫টি নির্বাহী পদে মোট প্রার্থী ছিলেন ৩৪ জন। এর মধ্যে দুই প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছেন ৩০ জন। বাকি চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী যাদের কেউই জিততে পারেননি। সদস্য পদে সর্বোচ্চ ৮৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন জাকির হোসেন চৌধুরী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৬ ভোট পেয়েছেন নোয়াখালী জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আব্দুল ওয়াদুদ পিন্টু। সাবেক ফুটবলার বিজন বড়ুয়া ও আরিফ হোসেন মুন সমান ৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। গত নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়া শওকত আলী খান জাহাঙ্গীর এবার হেরে গেছেন। এ ছাড়া গত কমিটি থেকে ছিটকে গেছেন ফজলুর রহমান বাবুল, ইকবাল হোসেন এবং অমিত খান শুভ্র। কোনোমতে টিকে গেছেন বর্ষীয়ান সংগঠক হারুনুর রশীদ, মাহফুজা আক্তার কিরণ, সত্যজিৎ দাস রুপু, ইলিয়াস হোসেনের মতো আলোচিত প্রার্থীরা। সদস্য পদে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো বাফুফেতে এসেছেন টিপু সুলতান, আমের খান, সাইফুল ইসলামরা। সর্বনিম্ন ৬৮ ভোট পেয়ে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মহিদুর রহমান মিরাজ।
নির্বাচনের খানিকটা আমেজ তোলা রইল ৩১ অক্টোবরের জন্য। সেদিন চতুর্থ সহ-সভাপতি পদটির জন্য লড়বেন মহি ও তাবিথ। দু’জনই ব্যক্তিগতভাবে দুই ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মহি ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন যুবলীগের নেতা। আর তাবিথ বিএনপির হয়ে মেয়র নির্বাচন করেছেন। এদের মধ্য থেকে শেষ হাসি কে হাসবেন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
