মানুষ যখন দেখে পুঁজিবাজারে সুশাসন আছে, তখন যারা ভালো তারা এ বাজারমুখী হয় এবং খারাপরা দূরে থাকে। অতীতে বাজার যদি সত্যিকার অর্থে গড়া যেত, তাহলে এ বাজারে এত যে কারসাজির কথা হয়, তা থাকত না। বিশেষ করে স্থায়ী আমানতের বিকল্প হিসেবে বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড থাকলে বাজারটা অন্যরকম উচ্চতায় থাকত।
গতকাল বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এসইসি কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠান হয়, যেখানে ওয়েবিনারের মাধ্যমেও অনেকে অংশ নেন।
তিনি বলেন, সুশাসন নিশ্চিতে সবার অভিজ্ঞতা নিতে চাই। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সবার সমস্যার কথাই শুনছি। যদিও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখেছি, কর্তাব্যক্তিরা দায়িত্বশীল পর্যায়ে গেলে তাদের চারপাশে বিশাল দেয়াল তুলে রাখেন। বর্তমান এসইসি এর বিপরীতে কাজ করছে। অনেক কাজ করলে কিছু ভুল হতে পারে, তবে ইচ্ছাকৃত ভুল হবে না।
এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের বাজারের প্রধান অংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, যদিও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বেশি দরকার। অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এসইসির বারবার আহ্বানের পরও তারা আসছে না। অর্থায়নের প্রয়োজনে কোম্পানিগুলোর ব্যাংকঋণে নির্ভর না করে পুঁজিবাজারে বন্ড ছেড়ে টাকা নিলে তাতে ব্যাংকের ওপর চাপ কমে এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতিও কমে আসবে। বিনিয়োগকারীদের স্থায়ী আমানতের বিকল্প বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি হবে। ধর্মপ্রাণ যেসব মানুষ সুদ পেতে চান না, তাদের জন্য সুকুক বন্ড আনতে দ্রুত কাজ করছি।
মূল প্রবন্ধে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়নের জন্য পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর্যায়ে বিশ্ব বাণিজ্যে এখন যেসব সুবিধা পাচ্ছি, তার অনেকটাই তখন থাকবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানিতে ১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। ওষুধ উৎপাদনে প্যাটেন্ট লাগবে। হয়তো এখন যে ওষুধ ১০ পয়সায় পাচ্ছি, তা কিনতে হবে ১০ টাকায়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত উন্নতি করতে হবে, ভালো উৎস থেকে অনেক বেশি বিনিয়োগ নিতে হবে। পুঁজিবাজার ছাড়া যার বিকল্প নেই। তার জন্য ভালো বিনিয়োগকারীও লাগবে। তাদের পরিবর্তিত পরিস্থিতিও বুঝতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক হুসেইন সামাদ বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান করতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) অনেক বেশি দরকার। ২০১৮ সালে জার্মানি পুরো বিশ্বে যেখানে ১৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে, তার মাত্র ২ দশমিক ৬২ কোটি ডলার এসেছে বাংলাদেশে। কভিডের কারণে বৈশ্বিক এফডিআই ৪০ শতাংশ কমলেও আমাদের বাড়ানোর সুযোগ আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে স্পেকুলেশন (ধারণা) থাকবেই। এখানে বিনিয়োগকারীর থেকে পরামর্শক বেশি। বিনিয়োগকারী সবার কথাই শুনবেন। কিন্তু কার কতটা কথা আমলে নেবেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগে কারও আসা উচিত নয়। তিনি বলেন, বিগত অনেক বছর পুঁজিবাজারে সুশাসন ছিল না। যেসব কোম্পানির আসার কথা নয়, তারা এসেছে। আর যাদের আসার কথা ছিল, তারা আসেনি। এতে করে ২০ টাকা প্রিমিয়ামে আসা শেয়ার ১-২ বছরে ফেসভেল্যুর নিচে চলে এসেছে। এখন তা হচ্ছে না। কারণ এখন শুভঙ্করের ফাঁকি চলবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ করলে ধৈর্য ধরতে হয়। ব্যক্তির বিনিয়োগ মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বাইরের দেশগুলোতে এমনটাই হয়। কিন্তু এখানে মিউচুয়াল ফান্ডের দিকে কোনো বিনিয়োগকারী ফিরেও তাকাতে চান না। কারণ এখানে কোনো নিয়মনীতি নেই। মেয়াদি ফান্ডের মেয়াদ বিনিয়োগকারীদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেড়ে যাচ্ছে। অন্য কোনো দেশে এটা ভাবাও যায় না। কিছু প্রভাবশালী সম্পদ ব্যবস্থাপক তদবির করে এটা করিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এসইসির দায় আছে। কারণ তারা তদবির শুনেছে। তদবিরে যদি প্রভাবশালীর কাছে কমিশন হেরে যায়, তবে এ কমিশনের থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।
গত ১০-১৫ বছর আগের তুলনায় পুঁজিবাজার বিষয়ে সরকারের মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন আবু আহমেদ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সব দেশে তালিকাভুক্ত, কিন্তু বাংলাদেশ নয়। কারণ আমরাই বলিনি। ইউনিলিভারের শেয়ার বাজারে নেই। কোম্পানিটি নিজে থেকে আসতে না চাইলে সরকার নিজের ৪০ শতাংশ থেকে অন্তত ৫ শতাংশ বিক্রি করে দিতে পারে। এদের আনতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা অনেক। এ কাজটি তাদের করতে হবে।
