আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীকে নির্ধারিত সাজা দিয়ে সমাজে এই ভীতি সৃষ্টি করা হয় যে, অপরাধ করলে এই শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে না হলে আর অপরাধীর সাজা দৃশ্যমান না হলে সমাজে অপরাধ-প্রবণতা কমে না। দেশের মানবাধিকারকর্মী ও নারী আন্দোলন নেত্রীরা সম্প্রতি হিসাব কষে দেখিয়েছেন, ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ মামলায় শেষ পর্যন্ত সাজা ঘোষণা হয়, সাজা কার্যকরের হার আরও কম। এই বাস্তবতার সাক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা যায়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান করা হলেও সেটা মানা হচ্ছে না। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে দেশের এমন ৯৫টি ট্রাইব্যুনালে অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার মামলা বিচারাধীন। অথচ সরকার বা হাইকোর্ট বিভাগ ১৮০ দিনের এই সময়সীমা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়।
আইন থাকা সত্ত্বেও যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার এই বাস্তবতাকে সাধারণভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বলে অভিহিত করে একে ধর্ষণ বন্ধ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা। এদিকে, যুগের বাস্তবতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। কিন্তু একদিকে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্ষতি ও বিচারহীনতার বাস্তবতা, আরেকদিকে নিত্যনতুন অপরাধের বিচারে বিদ্যমান আইনের নানা সীমাবদ্ধতায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। এ কারণে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি আইনের যুগোপযোগী সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে ১০ বছর, অপর্যাপ্ত বলছেন আইনজীবীরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ধর্ষণচেষ্টা, শ্লীলতাহানি ও পর্নোগ্রাফি আইনে বিদ্যমান আইনে সাজার বিধানের পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণচেষ্টা ও নির্যাতনের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সূত্র ধরে এই পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যাচ্ছে এই ঘটনার বিচারে অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে ১০ বছরের কারাদ-। দেখা যাচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (৪) উপধারা (খ) অনুযায়ী কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর এবং অন্যূন পাঁচ বছর কারাদ-। এছাড়া একই আইনের ১০ ধারায় কোনো নারীকে শ্লীলতাহানির সর্বোচ্চ সাজা অনধিক ১০ বছর এবং অন্যূন তিন বছর। আর পর্নোগ্রাফি আইনের ৮ (১) ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা, ৮ (২) ধারায় পাঁচ বছর ও ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৮ (৩) ধারায় পাঁচ বছর ও ২ লাখ টাকা অর্থদ-ের বিধান রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, যুগোপযোগী আইন না থাকা এবং প্রচলিত আইনের সংস্কার না হওয়ায় এমন বর্বর ও নিকৃষ্টতম ঘটনায় এ ধরনের সাজা হবে অপর্যাপ্ত।
একজন নারীকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণচেষ্টা ও নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে যেভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা হলো তাতে সারা জীবনের জন্য মানসিকভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার এবং হাতে হাতে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সুবিধার কারণে আজকাল এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। প্রায়ই নারীদের ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে। অপরাধীরা জোরপূর্বক নারীদের ছবি-ভিডিও ধারণ করছে এবং সেসব দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে সম্মতিহীন যৌনসম্পর্কে বাধ্য করার চেষ্টা, টাকা আদায় করার চেষ্টাও হচ্ছে। এমনকি বেগমগঞ্জের ঘটনার মতো নির্যাতনের ভিডিও ধারণ ও সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়াও একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে এ অপরাধগুলোর যে সাজা তা একেবারেই অপর্যাপ্ত। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা তাই এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে আরও দৃষ্টান্তমূলক এবং আমৃত্যু কারাদ-ের সাজার দাবি করছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কের একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। সাম্প্রতিককালে ধর্ষণের প্রায় প্রতিটি আলোচিত ঘটনাতেই শাসক দলের ছত্রছায়ায় থাকা রাজনৈতিক দুর্বৃৃত্তদের সম্পৃক্ত থাকাও এই বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়। একদিকে রাজনৈতিক-পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভ আরেকদিকে সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার না থাকা এবং সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বদল না হওয়া নারীকে আরও ক্ষমতাহীন করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ও যুগোপযোগী সংস্কার নিশ্চিত করা সরকারের আশু কর্তব্য। একইসঙ্গে সমাজকে একটি যথাযথ বার্তা দিতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে যুক্ত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই জিরো টলারেন্সের নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
