বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষার মান বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পড়াশোনার মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না। শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় অনেক সময় নগরে পরিণত হয়। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।
একনেক সভায় ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রথম সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মূল খরচ ছিল ৪৯১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। গতকালের সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮৪০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সময় একই রয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার (প্রধানমন্ত্রীর) মন্তব্য ছিল আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বানাব। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শহর হয়ে যায় অনেক সময়। হাজার হাজার লাখ লাখ শিক্ষার্থী এক জায়গায় পড়ে। এতে পড়াশোনার মান রক্ষা হয় না এবং পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটা যেন বিশ্ববিদ্যালয় থাকে। সংখ্যাটা নিয়ে ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কাজ করছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ট্র্যাকিং করা হবে। মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। পুনরায় তিনি এ বিষয়টা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু জাতীয় কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয়, এটাকে আলাদা মর্যাদায় নিয়ে যেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় যেন বাজার না হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় যেন ঘুরেফিরে নগর না হয়।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা, প্রকাশনা হতে হবে। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, আমরা যতটা আশা করি প্রকাশনা হওয়া উচিত, সেটা পাই না। প্রকাশনা আরও কম হয়। তিনি এ সমন্ধে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এটা বাড়াতে হবে। টাকার কথা প্রায়ই বলা হয়। এটা যথাযথ নয়। প্রায়ই দেখা যায় টাকা থাকে, টাকা ব্যবহার করা হয় না। টাকা যদি চায়, দেব। এ বিষয়ে একটা জেনারেল অর্ডার আছে। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার বলেছেন, টাকা আমি ব্যবস্থা করে দেব গবেষণা করেন, কাজ করেন, প্রকাশনা বের করেন। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় জার্নাল আছে, সেসব জায়গায় কেন পাবলিস্ট হবে না?’
পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘নদীভাঙন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করতে হবে। সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চে অর্থাৎ শীত মৌসুমেই কাজ শেষ করতে হবে। নদীভাঙন রোধ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নির্মাণ কাজে কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না। একনেকে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্প প্রসঙ্গে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’
গতকাল একনেক সভায় ‘জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মাল্টি-সেক্টর’ প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন আনা হলে তা পাস হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকার চার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকার দেবে ৭৪০ কোটি এবং বিদেশি অনুদান হিসেবে মিলবে ৯১৯ কোটি টাকা। গতকাল প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবরা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সভায় অংশ নেন।
সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, একনেকে তিনটি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মাল্টি-সেক্টর’ প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন আনা হয়েছে। এ প্রকল্পটির ব্যয় ও সময়ও বেড়েছে। ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা থেকে ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২১ সালের নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন ২০২৪ সালের জুনে শেষ হবে।
রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের মহাসচিব এর আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। তারা ফিরে গিয়ে এ অনুদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে রোহিঙ্গারা আসার পর স্থানীয় জনগণের অনেক অসুবিধা হয়েছে। তাই এ প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম জেলা উপকূলীয় এলাকার পোল্ডার নং-৬২ (পতেঙ্গা), পোল্ডার নং-৬৩/১ বি (আনোয়ারা এবং পটিয়া) পুনর্বাসন’ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন আনা হয়েছে। এতে খরচ ও সময় বেড়েছে। ২৮০ কোটি ৩০ লাখ থেকে খরচ বেড়ে প্রথম সংশোধনীতে হয় ৩২০ কোটি ২৯ লাখ এবং গতকালের সংশোধনের পর আরও বেড়ে দাঁড়াল ৫৭৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের মে মাসে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২০ সালের জুন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের ‘হাতে-কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণে মহিলাদের গুরুত্ব দিয়ে বিটাকের কার্যক্রম সম্প্রসারণপূর্বক আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন (ফেজ-২)’ নামে একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে একনেক সভায়। এতে খরচ হবে ১২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
একনেক সভায় আরও অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক।
গুদামে সংগৃহীত চালের গুণগত মানে প্রধানমন্ত্রীর সন্তোষ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি গুদামে সংগৃহীত চালের নমুনা পরীক্ষা করে এর গুণগত মানে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গতকাল সকালে তিনি তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সারা দেশের সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো (সিএসডি) এবং লোকাল স্টোরেজ ডিপো (এলএসডি) থেকে সংগ্রহ করা সিদ্ধ এবং আতপ চালের নমুনা পরীক্ষা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর ভাদ্র মাসে গুদামগুলোতে থাকা নিচের দিকের চাল ওপরে এবং ওপরের চাল নিচে রাখার নির্দেশনা দেন। যাতে করে অপেক্ষাকৃত আগে ক্রয় করা চাল প্রথমে বিতরণ করা যায়। তিনি ২০১৯ সালে সংগ্রহ করা চাল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিতরণের জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বগুড়ার সান্তাহারে স্থাপিত ওয়্যারহাউসের মতো দেশের অন্যান্য প্রান্তেও খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের আধুনিক গুদাম নির্মাণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। যাতে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অধিক পরিমাণে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশের সব গুদামে সংগৃহীত চালের তথ্য একটি ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণের নির্দেশনাও দেন।
এ সময় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
