আট বছর আগে সৌদি আরব যান ঢাকার কেরানীগঞ্জের ফিরোজ আহমেদ। শুরুতে রোজগার ভালো হলেও বিগত আড়াই বছর সেখানে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন তিনি। আকামা নবায়নে কফিলকে (নিয়োগকর্তা) প্রায় ৩ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হন। এরপর পেশায় রংমিস্ত্রি ফিরোজ দেশটিতে অবৈধ হয়ে একে তো কাজ পাননি, গ্রেপ্তার এড়াতে এ শহর ও শহর পালিয়ে বেড়িয়েছেন। করোনা মহামারী দেখা দিলে বন্ধ হয়ে যায় সবকিছু। গত এপ্রিলে খালি হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। বর্তমানে কর্মহীন ফিরোজ স্ত্রী-সন্তান, বৃদ্ধ মা-বাবাসহ ছয় সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। টিকে থাকার জন্য তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি কেরানীগঞ্জের রামেরকান্দা গ্রামে কথা হয় ফিরোজের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আট বছর বিদেশ থেকে একটা কানাকড়িও হাতে নাই। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ পাওয়ার চেষ্টা চালাইতাছি। এইট্যা না পাইলে আমি শ্যাষ।’ তার মতোই শূন্য হাতে সৌদি আরব থেকে ফেরা কেরানীগঞ্জের আরেক যুবক আব্দুল মিয়াও ঋণের চেষ্টা করছেন। সেটি পেলে ছোটখাটো ব্যবসা দেবেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিশ্বের ১৬০টি দেশে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, নানা কারণে ২০১৭ সালের শেষদিক থেকে ২০১৯ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরব থেকে ফিরতে বাধ্য হন। এর বাইরে মালয়েশিয়া থেকেও ফেরেন অসংখ্য শ্রমিক। করোনা মহামারী এ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির হিসেবে, করোনাকালে প্রায় ৩ লাখ কর্মী দেশে ফিরেছেন। যদিও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাবে, গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ২৯টি দেশ থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫৮ প্রবাসী দেশে এসেছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৮ জন পুরুষ ও নারী ১৬ হাজার ৬৪০ জন।
কাজ হারিয়ে ফেরত আসা প্রবাসীর পাশাপাশি অনেকে প্রতারিত হয়ে ফিরতে বাধ্য হন। এমনই একজন শরীয়তপুরের আহমেদ রনী গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার ফকিরাপুলের রিক্রুটিং এজেন্সি শেরপুর ইন্টারন্যাশনালকে ৪ লাখ টাকা দিয়ে কম্বোডিয়া যান। কিন্তু সেখানে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এক পর্যায়ে কাজ না পেয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রনীসহ কয়েকজন দেশে ফিরে আসেন।
জীবিকা সংকটে বিদেশফেরতরা : গত ১২ আগস্ট দেশে ফেরা কর্মীদের ওপর চালানো এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। সেখানে ৭০ শতাংশ কর্মী জীবিকার সংকটে রয়েছেন বলে জানান। ৫৫ শতাংশের দাবি, তাদের ওপর ঋণের বোঝা চেপে বসেছে। এ ধরনের বেশিরভাগ শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে জানান, বিদেশ যেতে না পারলে এবং দেশেই স্থায়ী হতে হলে ঋণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। সরকারি ঋণ পেতে তারা চেষ্টা করছেন।
গত ২২ মে প্রকাশিত এক জরিপে ব্র্যাক জানায়, নানা কারণে দেশে ফেরা কর্মীদের ৮৭ শতাংশের আয়ের পথ বন্ধ। সরকারি-বেসরকারি কোনো সাহায্য পাননি ৯১ শতাংশ। জরিপে ৭৪ শতাংশ প্রবাসী জানান, তারা প্রচণ্ড মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও ভয়ে আছেন। ৫২ শতাংশ প্রবাসীর জরুরিভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
গত ২৭ জুলাই প্রকাশিত রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) জরিপে বলা হয়, করোনাকালে ৬১ শতাংশ পরিবারে রেমিট্যান্স আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। ৭৮ শতাংশ শ্রমিককে রাস্তা থেকে ধরে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ৭৪ শতাংশ কর্মী তাদের অর্থ নিয়ে আসতে পারেননি।
এ বিষয়ে রামরুর চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিশ্বে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়বে। এজন্য বিদেশফেরতদের ঋণ সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিতে হবে।’
প্রবাসীদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ : প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদেশফেরতদের পুনর্বাসনে সরকার ৭০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আবারও বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য প্রবাসীদের নিবন্ধিত হতে হবে। ইতিমধ্যে বিপদগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রায় ১০ কোটি টাকার জরুরি খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশফেরত কর্মীদের ৪ শতাংশ সুদে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এজন্য ব্যাংকটিকে ২০০ কোটি টাকা দিয়েছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিদেশফেরত অভিজ্ঞ কর্মীদের যথাযথ স্বীকৃতি ও সনদায়নের উদ্যোগ, অসহায়, ক্ষতিগ্রস্ত, দরিদ্র কর্মী ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীর পরিবারের সদস্যদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ দেশে চলমান সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
