বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার কমে এখন ৫১ শতাংশ। তারপরও দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ সারির ১০টি দেশের তালিকাতেও রয়েছে বাংলাদেশের নাম। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ : অ্যা প্রোফাইল অব প্রোগ্রেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গতকাল বুধবার প্রকাশ করে সংস্থাটি।
এতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে নিরসন করতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে সচিবালয় প্রান্ত থেকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেছা ইন্দিরা ও অন্যান্য কর্মকর্তা এতে যুক্ত হন। জাতিসংঘের প্রতিনিধি, উন্নয়ন অংশীদার এবং কিশোর ক্লাবের সদস্যরাও এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ইউনিসেফের সিনিয়র অ্যাডভাইজার ক্লডিয়া কাপ্পা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এখন বাংলাদেশে যেসব বিবাহিত তরুণীর বয়স ২০ থেকে ২৪ বছর, তাদের ৫১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে শিশু থাকা অবস্থায়। তার মানে দেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ মেয়ের বিয়ে হয়েছে তাদের ১৮তম জন্মদিনের আগে। এর মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মেয়েকে ১৫ বছরের আগেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, বাল্যবিয়ের শিকার শিশুদের বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারের ও গ্রামে বাস করে। বাল্যবিয়ের শিকার মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার অবিবাহিত মেয়ে শিক্ষার্থীদের তুলনায় চারগুণ বেশি। বিবাহিত প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রতি পাঁচজন ১৮ বছরের আগে ও প্রতি আটজন ২০ বছরের আগে সন্তান জন্ম দেয়। বাল্যবিয়ে কমানোর অগ্রগতি উচ্চবিত্ত ও ধনী শ্রেণির মধ্যে বেশি বলেও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
দেশের মধ্যে বাল্যবিয়েতে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এ বিভাগে ৯০ লাখ নারীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ জেলায় বাল্যবিয়ের হার ৭৩ শতাংশ। বাল্যবিয়ে সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম জেলায়, ৩৯ শতাংশ।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাল্যবিয়ে বন্ধ করা বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ উভয়েরই একটি অগ্রাধিকার। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং ২০৪১ সালের মধ্যে তা বন্ধের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশে আরও পরিবর্তন আনতে প্রচেষ্টা প্রয়োজন। জাতীয় লক্ষ্যপূরণের জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধের হারে অগ্রগতি গত দশকের তুলনায় কমপক্ষে আটগুণ এবং এসডিজির লক্ষ্য পূরণের জন্য ১৭ গুণ দ্রুততর করতে হবে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের উপপ্রতিনিধি ভিরা মেন্ডোনকা বলেন, ‘একসঙ্গে আমাদের অবশ্যই ক্ষতিকর রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে এবং বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে। মানবাধিকারের এ লঙ্ঘন ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনছে, যা শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশব ছিনিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, চলমান কভিড-১৯ মহামারী এখন বাল্যবিয়ে বন্ধে অগ্রগতিকে আবারও পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার হুমকিতে ফেলেছে। শিশু এবং পরিবারগুলো যখন স্কুল বন্ধ হওয়া, আয় কমে যাওয়া এবং ঘরে বেড়ে যাওয়া চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, তখনই বাল্যবিয়ের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ইউনিসেফ যে স্কুলগুলো নিরাপদে পুনরায় খোলার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে এটি তার অন্যতম কারণ। এমনকি সাধারণ সময়েও অবিবাহিত মেয়েদের তুলনায় বিবাহিত মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ছিটকে যাওয়ার ঝুঁকি চারগুণের বেশি।
