বিশ্বব্যাংকের ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস

এডিবির সঙ্গে তফাত আকাশ-পাতাল

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২০, ০২:১৮ এএম

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কায় বিশ্বের তৈরি পোশাক রপ্তানির বাজার ও রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে ভাটায় ভুগবে বাংলাদেশ। ফলে অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বে। যদিও চলতি বছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল অন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ফলে এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। চলতি অর্থবছরে ৮.২ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস রিপোর্টে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মহামারীর অভিঘাত প্রলম্বিত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়া নজিরবিহীন অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা, লাখ লাখ মানুষকে এ মহামারী চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়ে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে দাবি সংস্থাটির।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান কিছু বলতে রাজি হননি। এ সময় সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। জানতে চাইলে জিইডিরসদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও এডিবি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। পদ্মা সেতুর ইস্যুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর এডিবিও সরে গিয়েছিল। অথচ জিডিপি প্রক্ষেপণ নিয়ে দুই সহযোগী সংস্থার প্রক্ষেপণ আকাশপাতাল পার্থক্য। এডিবি বলছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৮ শতাংশ আর বিশ^ব্যাংক বলছে ১.৬ শতাংশ।’

তিনি বলেন, ‘আমি একজন দক্ষ পরিকল্পনা প্রণেতা ও অর্থনীতিবিদ হিসেবে বলছি, বিশ^ব্যাংকের এ প্রক্ষেপণ অযাচিত, ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। কারণ এটি বিষয়নিষ্ঠ (সাবজেকটিভ), বস্তুনিষ্ঠ নয়। এ প্রক্ষেপণে অসারতা ও অপ্রাসঙ্গিকতা ফুটে উঠেছে। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ছাড়া কোনো উপযোগিতা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ^ব্যাংককে তাদের প্রক্ষেপণ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্যও ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল। কিন্তু মহামারীর মধ্যে দুই মাসের লকডাউন আর বিশ্ববাজারের স্থবিরতায় তা বড় ধাক্কা খায়। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সরকারি হিসেবে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে আসে, যদিও এই অঙ্ক আরও কম হওয়ার কথা বলে অনেক বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ সামনে কমে আসতে পারে, সেই সঙ্গে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে কর্মীদের আয় কমে আসায় ভোগব্যয় বাড়ার সুযোগ থাকবে না। ক্রেতা দেশগুলোতে তৈরি পোশাকের চাহিদা না বাড়লে বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয়ের দিক দিয়েও বাংলাদেশকে আরও ভুগতে হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা বাড়তে শুরু করলেও তা কতটা টেকসই হবে, সে সংশয় থাকবে। মহামারীর মধ্যেও গত তিন মাসে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, কাজ হারিয়ে দেশে ফেরার আগে প্রবাসীরা তাদের সব সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, রেমিট্যান্সে এই উল্লম্ফন হয়তো তারই ফল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে কর্মীর চাহিদা তেমন বাড়ার আভাস দেখা যাচ্ছে না। ফলে এ অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসতে পারে।

এদিকে স্বল্পমেয়াদের জন্য হলেও দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। কৃষির বাইরে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের যে কর্মীরা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে এর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা দশা বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে। তবে এ ধাক্কা সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা সঠিক পথেই আছে। তার পরামর্শ, অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো যেন টেকসই হয়, সেজন্য সরকারকে আর্থিক খাত ও ঋণ ব্যবস্থাপনার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। আর্থিক খাতকে মজবুত করার দিকে নজর দিতে হবে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকর ঢাকা অফিসের মুখপাত্র মেহরীন এ মাহবুব ও সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলে তারা রিসিভ করেননি।

বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৭ শতাংশ সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে, যেখানে গত পাঁচ বছর ধরে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ওপরে থাকছিল। রিপোর্ট অনুসারে, প্রবৃদ্ধিতে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেবে বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধি অর্জনে দক্ষিণ এশীয় সব থেকে খারাপ অবস্থা ভারতের মাইনাস ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি হবে ০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেশি অর্জন করবে মালদ্বীপ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, এরপর শ্রীলঙ্কা ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে আফগানিস্তান ২ দশমিক ৫, ভুটান ১ দশমিক ৮, নেপাল ০ দশমিক ৬ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের (এডিও) হালনাগাদ প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। ওই সময় সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ বলেন, মহামারী থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার পেতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য ও মহামারী পরিচালন ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সত্ত্বেও সরকার উপযুক্ত অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সুসংহত করেছে। দরিদ্র ও দুর্বলদের জন্য মৌলিক সেবা ও পণ্যাদি নিশ্চিত করেছে। রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সগুলোতে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য বিদেশি তহবিল সুরক্ষারসহ সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে এ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে গত ১৫ এপিলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের পূর্বাভাসে জানায়, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রেক্ষাপটে চলতি বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে। তবে ২০২১ সালে তা বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ হবে বলে মনে করে আইএমএফ। ২০২১ সালের পূর্বাভাসটি নির্ভর করছে করোনাভাইরাসের বিস্তার কমে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসার ওপর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত