পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২০, ১১:৪৫ পিএম

গত বছর থেকে দেখছি, ভারতে বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটি হুট করে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। পণ্যটির দাম এক লাফে ৫ থেকে ১০ গুণ বেড়ে যায়। এ নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। একশ্রেণির অসৎ অতিলোভী ব্যবসায়ী এই সুযোগে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে মানুষের কষ্টকে আরও কঠিন করে তোলেন। গত বছর ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ নভেম্বর মাসে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। যদিও ওই পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা দামে। এবারও একই কারণে বেড়ে গেছে পেঁয়াজের দাম। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা। কী দুর্ভাগ্য আমাদের!

এদেশের কর্মঠ কৃষক ভাইয়েরা যদি গত পাঁচ বছরে ভুট্টার উৎপাদন দ্বিগুণ করতে পারেন, চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের শীর্ষ

তৃতীয় চাল উৎপাদনকারী দেশের গৌরব অর্জন করতে পারেন, বছরে ১ কোটি ৭২ লাখ টন সবজি উৎপাদন করতে পারেন, তা হলে বছরে কেন তারা আর মাত্র ১২ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করে পরনির্ভরশীলতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারবেন না? আমার দৃঢ় বিশ্বাস তারা পারবেন। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, কর্মসূচি গ্রহণ এবং তাদের উদ্বুদ্ধকরণ।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ১০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। এত আলুর প্রয়োজন নেই আমাদের। আলুর প্রয়োজন মাত্র ৮০ লাখ টন। বর্তমানে আলু বিদেশে রপ্তানিও করা যাচ্ছে না। তা হলে কৃষক কেন অতিরিক্ত আলু উৎপাদন করে অযথা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন? ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন? রাস্তায় আলু ঢেলে মানববন্ধন করবেন?

ধান কাটার পর ওই জমিতে কৃষক অতি আগ্রহ করে আলু রোপণ করেন। কারণ ১. আলু ৭০ থেকে ৯০ দিনের ফসল। ২. পণ্যটি হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। ৩. অন্য যেকোনো মাঠ ফসলের চেয়ে ফলন বেশি। ৪.বাজারে চাহিদা প্রচুর। ৫. লাভও হয় ভালো। ৬. সুলভে উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ পাওয়া যায়। ৭. কিছু সময় দেশীয় পদ্ধতিতে ঘরে সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

পেঁয়াজ উৎপাদন করে কৃষক যদি আলুর মতো সুযোগ-সুবিধা পেতেন, তাহলে তারা অবশ্যই পেঁয়াজ চাষের জমি ও উৎপাদন বাড়াতেন। আগাম আমন ধান কাটার পর ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে দিয়ে ৭০-৭৫ দিন জীবনকালের গ্র্যানুলা ও বারি ৭৫ জাতের আলু উত্তোলনের পর সেই জমিতে মধ্য ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে পেঁয়াজের চারা রোপণ করতে পারেন কৃষক। আমরা ৩ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমি থেকেই প্রয়োজনীয় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদন করে বাকি ১ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমি পেঁয়াজ ও রসুন চাষের জন্য ছেড়ে দিতে পারি। প্রতিবছর বিদেশ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ ও ৭ লাখ টন রসুন আমদানি করে আমরা কেন ১৫ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় করব? প্রয়োজনের অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমি থেকে আমরা যদি ৭০ হাজার হেক্টর জমিও পেঁয়াজ চাষের জন্য পাই, তাহলে হেক্টরে ১৩ টন হিসেবে ওই জমি থেকে আরও ৯ লাখ ১০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারি।

 প্রতি বছর পেঁয়াজ বীজের চাহিদা ৮০০ থেকে ১০০০ টন। দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন হয় মাত্র ৫০-৬০ টন। বাকি বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন করেন। কিছু সীমান্তের ওপার থেকেও আসে। কৃষক নিজে যে বীজ উৎপাদন করেন, সেসব বীজের গুণগতমান তেমন ভালো নয় এবং ফলনও কম। তাই আমরা গুণগত মানের বীজ উৎপাদন ও ব্যবহার করে, হেক্টরপ্রতি ফলন দুই টন বাড়াতে পারি। বিশ্বে পেঁয়াজের গড় ফলন ১৮ টন। ভারতে ১৫ টন, পাকিস্তানে ১২.৫ টন আর বাংলাদেশে ১১ টন এটাকে সঠিক কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ১৩ টনে উন্নীত করা যাবে । তাহলে ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমি থেকে ১৩ টন হিসেবে বছরে ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন করে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব।

লালতীর সিড লিমিটেডের তিনটি উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজের জাত আছে। এগুলোর গড় ফলন হেক্টরে ১৫ টন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ৬টি উচ্চ ফলনশীল জাত আছে। এর মধ্যে তিনটি শীতকালীন ও ৩টি গ্রীষ্মকালীন। জাতগুলোর গড় ফলন ১৩ থেকে ১৮ টন। এসব উচ্চ ফলনশীল বীজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন এবং কৃষকের জমিতে ব্যবহারের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে যৌথ উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। গুণগতমানের এক কেজি পেঁয়াজ বীজের দাম ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। সেই উৎপাদিত পেঁয়াজের বীজ যদি সময়মতো বিক্রি না হয়, তা হলে বিএডিসি ও বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের মতো কাজে ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

বাংলাদেশে শুধু শীতকালেই পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়। আমাদের বারি উদ্ভাবিত তিনটি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত আছে। এসব জাতের পেঁয়াজ খরিপ মৌসুমে দেশের উঁচু ও মধ্যম উঁচু জমি, যেখানে বন্যার পানি ওঠার সম্ভাবনা নেই, সেসব এলাকায় চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য প্রথম প্রথম উদ্যোগী কৃষকদের বিনামূল্যে পেঁয়াজের বীজ, সার, প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করতে হবে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে কৃষককে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোকেও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য মাঠ দিবস, পদ্ধতি ও ফল প্রদর্শনী এবং ফিল্ড ট্যুরের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। আমদানিনির্ভর মসলা চাষের জন্য শতকরা ৪ শতাংশ হারে কৃষিঋণ প্রদানের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। দেখা গেছে, যে বছর কৃষক পেঁয়াজে ন্যায্যমূল্য পান, পরের বছর তাঁরা বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ উৎপাদন করেন। এজন্য উৎপাদন মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখে কৃষককে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তা করতে হবে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৮-১০ শতাংশ। গত এক বছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার টন এটা কম অর্জন নয়। এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের গড়ে খরচ হয় ১৮ টাকা। পেঁয়াজের শতকরা ২৫ শতাংশ বিনষ্ট অপচয় যোগ করলে প্রকৃত উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ২২.৫০ টাকা। এসব বিষয় আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে।

একসময় আলু বীজ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ১০ থেকে ১২ টন। বর্তমানে ২৩ টন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ৮১টি উচ্চ ফলনশীল আলুর জাত উদ্ভাবন করে। বিএডিসি ও ব্র্যাকের মতো বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিসু কালচার পদ্ধতিতে ভাইরাসমুক্ত ভিত্তি আলু বীজ উৎপাদন করছে। ভিত্তি বীজ থেকে উৎপাদিত হচ্ছে প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত বীজ। কৃষক সুলভ মূল্যে পাচ্ছেন উৎকৃষ্ট মানের আলু বীজ। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত বীজ দিয়ে চাহিদার ৯০ ভাগ পূরণ হচ্ছে। ফলন বহুগুণ বাড়ায় উৎপাদন খরচও কমেছে কৃষকের।

বর্তমানে সারা দেশে আলু সংরক্ষণের ৪০৪টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারের ধারণ ক্ষমতা-৫০ লাখ টন। কৃষক, ব্যবসায়ী ও বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের উৎপাদিত আলু ও বীজ আলু হিমাগারগুলোতে সহজে সংরক্ষণ করতে পারেন। এসব কারণেই দেশে বছরে ১ কোটি ১০ লাখ টন আলু উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।

পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানে একটি খেজুর প্রক্রিয়াকরণ এবং একটি পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে চীন সরকারের কাছে। আমাদের দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় চারটি পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এসব সংরক্ষণাগার তৈরি হলে অবশ্যই দেশে আলুর মতো পেঁয়াজের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। দেশ হবে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশকে আর পেঁয়াজের জন্য ভারতের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হবে না। বিমান দিয়ে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে হবে না। ভোক্তাকেও ১০ গুণ বেশি মূল্যে পেঁয়াজ কিনে খেতে হবে না। বেঁচে যাবে দেশের কষ্টার্জিত সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। কৃষকও পণ্যটি বিক্রি করে পাবেন ন্যায্যমূল্য ।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লি. (নাটোর)

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত