যখনই কোনো অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তা বৈশ্বিক হোক বা আঞ্চলিক, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর বিপুল আঘাত এসে পড়ে রিয়েল এস্টেট ইন্ডাস্ট্রি বা আবাসন শিল্প খাতের ওপর। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে চাঙ্গাভাব কাটালেও ২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের আবাসন শিল্প খুব মন্দাবস্থায় পতিত হয়েছিল। বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই শিল্প খাতে বিনিয়োগ এবং আস্থা অনেক কমে গিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময়ের প্রচেষ্টায় এই খাতে ২০১৭ সাল থেকে আবার উন্নতি হচ্ছিল। ২০২০ সালে এই খাতে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার ধারণা করা হচ্ছিল। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এই ধারণাকে আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী করে।
কিন্তু এ বছরের মার্চ মাসে এসেই এই চিত্র রাতারাতি বদলে যায়। করোনা মহামারীর ভয়াল থাবায় সবকিছুই থমকে যায়। জুন-জুলাই মাসে এসেও এর ভয়াবহতা দেখা যায়, যখন করোনা সংক্রমণ চূড়ায় উঠেছিল। তবে আগস্ট মাস থেকে সংক্রমণের হার অনেকটা কমতে থাকে। এখন করোনার শুরুর দিকের ভয়াবহতা অনেকটা কমে আসায় জনসাধারণ মহামারীকালের জীবনযাপনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। করোনা পরিস্থিতি এমন এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা যে, অনেক কিছুই আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না, কিন্তু পালন করতে হচ্ছে। এটাকেই সবাই ‘নিও নরমাল’ বলে আখ্যায়িত করছেন। আমরা এসব নিও নরমালে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছি। এই মহামারীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের জীবনকে এক নতুন স্বাভাবিকতায় সাজিয়ে নিচ্ছি।
আবাসন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মোট জিডিপির ৭ শতাংশ আসে সরাসরি আবাসন খাত থেকে, এছাড়া লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিগুলোসহ জিডিপিতে অবদান ১২-১৪ শতাংশ। এই খাতে ৩৫ লাখ জনশক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৭ লাখ দক্ষ ও ২৮ লাখ অদক্ষ শ্রমিক। তাই এই ক্রান্তিকালীন অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতের মতো আবাসন খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকার বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, যে কারণে এই খাত অনেক গতিশীল হবে।
এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এই খাতে অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ। এই ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের সময় অল্প কিছু চার্জ প্রদান করে এই খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে। আমরা আশা করছি এই টাকাগুলো এখন বিদেশে পাচারের পরিবর্তে দেশে বিনিয়োগ হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখবে। এছাড়াও রিহ্যাব এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের বহুদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ফ্ল্যাট এবং কমার্শিয়াল স্পেসের রেজিস্ট্রেশন কয়েক দফায় প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন খরচ ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ১৫ শতাংশ থেকে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। যা এই খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কারণে গ্রাহকদের খরচ অনেকাংশে কমেছে।
এছাড়াও সামগ্রিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের হার কমে যাওয়াতে ফ্ল্যাট লোনের ইন্সটলমেন্ট অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যা গ্রাহককে ব্যাংক লোনের মাধ্যমে এই খাতে বিনিয়োগ করতে আরও উৎসাহিত করবে। অনেকদিন পরে হলেও আবাসন খাতের গতিশীলতা বাড়ানোর জন্য এই সব কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় সরকার সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট আলমগীর সামসুল আলামীনকে। রিহ্যাব নেতা হিসেবে সরকারকে এই ব্যাপারে বোঝাতে তার উদ্যোগ কাজে লেগেছে। ফলে সরকারের কাছ থেকে এখন এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো আমরা পেয়েছি, যা এই খাতকে আরও গতিশীল করবে।
তবে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সামগ্রিক স্থবিরতার কারণে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ এরই মধ্যে অনেক পিছিয়ে গেছে। ফলে এরই মাঝে প্রকল্পগুলো প্রতিশ্রুত হস্তান্তর শিডিউল পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এই বিলম্ব পুষিয়ে নিতে এবং এর ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনতে প্রয়োজন পড়বে সবার সম্মিলিত প্রয়াস। সরকার, রিহ্যাব, গ্রাহক, ভূমি মালিক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কনসালটেন্ট, সাপ্লাইয়ারসহ রিয়েল এস্টেট খাতের সব স্টেক হোল্ডারদের যার যার অবস্থান থেকে এই শিল্প খাতকে উজ্জীবিত করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
আমার মনে হয় বর্তমান সময় আবাসন খাতে বিনিয়োগের জন্য আদর্শ সময়। এই খাতের বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবেই স্থিতিশীল এবং দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে যথার্থ মুনাফা নিশ্চিত করে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে সবাইকে ‘পজিটিভ মাইন্ড সেট’-এ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে এগিয়ে আসতে হবে। কাজের গতি স্বাভাবিক রাখতে পারলেই সবার মাঝে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা বাড়বে বলে ধারণা করা যায়।
বিদ্যমান বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদে আবাসন খাতকে আরও গতিশীল করতে আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ কার্যকর সুফল বয়ে আনতে পারে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
১. সরকার ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করা। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে যথাযথ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। রিহ্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকেই এই বিষয়ে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।
২. অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শনের ব্যাপারে অন্তত আগামী পাঁচ বছর কোনো প্রকার জবাবদিহি ছাড়াই বিনিয়োগের এই ধারাটা রাখতে হবে, যেন এক বছর পরই এই সুযোগটা বন্ধ না হয়ে যায়। অপ্রদর্শিত আয় বা ট্যাক্স ফাইলে ওঠেনি এমন হাজার হাজার কোটি টাকা প্রত্যেক বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, ওই টাকা দেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলে প্রকারান্তরে দেশেরই লাভ হবে।
৩. গ্রাহক সাধারণের ইতিমধ্যে গৃহীত ঋণের ক্ষেত্রে সহনীয় কিস্তি সুবিধা এবং অন্তত এক বছরের গ্রেইস পিরিয়ড দেওয়ার কথা বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন গ্রাহকদের জন্য সহজ শর্তে ৫ শতাংশ হারে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে রিহ্যাবকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে এই উদ্যোগ নিতে হবে। নাহলে অনেক ফ্ল্যাট অবিক্রীত থাকবে, মূল্যের অযৌক্তিক পতন ঘটবে, ফলে ব্যবসায় স্থবিরতা ও পুঁজিতে ধস নামার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।
৪. নগরায়ণ প্রক্রিয়াকে সামগ্রিকভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, বিকেন্দ্রীকরণ এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরীর পাশাপাশি অন্যান্য জেলা বা অঞ্চলভিত্তিক টাউনশিপ পরিকল্পনা করার এখনই আদর্শ সময়। উদাহরণ স্বরূপ, ঢাকায় পূর্বাচল এবং চট্টগ্রামে অনন্যা আবাসিক এলাকায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা গেলে, এ ধরনের টাউনশিপ প্রকল্পগুলোর ফ্ল্যাটগুলো মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে বলে মনে করি।
৫. বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান যদি এগিয়ে আসে, ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব মেয়াদি ঋণ সুবিধা প্রদান করে তাহলে হয়তো ভাড়ার টাকায় গ্রাহকদের জন্য ফ্ল্যাটের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
৬. ফ্ল্যাট বা জমির রেজিস্ট্রেশন ব্যয় আরও কমিয়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এছাড়াও গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের মতো সেকেন্ডারি ফ্ল্যাট বিক্রিকে আরও গতিশীল করার জন্য দ্বিতীয়বার ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ আরও কমিয়ে আনা দরকার, তাহলে এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে।
উপরোক্ত প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে আবাসন শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, সঙ্গে সঙ্গে অগ্রগতি আসবে লিঙ্কেজ খাতে থাকা রড, সিমেন্ট, ইট, টাইলস ইত্যাদিসহ হাজার রকমের ফিনিশিং আইটেমের শতাধিক শিল্প খাতে। কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে লাখ লাখ নির্মাণ শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট জনবলের।
সবশেষে বলতে চাই, চলমান করোনা পরিস্থিতি আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় শুধুমাত্র একটি ভাইরাসের সংক্রমণ বা অসুখ নয়, এখন এটিই নতুন বাস্তবতা। এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে।
লেখক প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিপিডিএল
