স্বাস্থ্যবিধি নেই গণপরিবহনে

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২০, ০১:২৮ এএম

তিন মাস বাড়তি ভাড়ায় চলাচল করার পর গত পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে আগের ভাড়ায় ফেরে গণপরিবহন। ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের নিয়মও তুলে নেওয়া হয়। তবে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে পরিবহনগুলোকে কয়েকটি শর্ত বেঁধে দেয় সরকার। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে মাস্ক পরতে হবে, স্যানিটাইজার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বা দাঁড়ানো যাত্রী বহন করা যাবে না। কিন্তু গত দেড় মাসেও গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হয়নি।

গত কয়েকদিনে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলরত সিটি বাস ও দূরপাল্লার বাসগুলোতে সরেজমিন দেখা গেছে করোনা সংক্রমণরোধে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা রয়েই গেছে। বাসচালক, হেলপার ও যাত্রী কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানতে নারাজ। বাস ছাড়ার আগে বাসকে সংক্রমণমুক্ত করা হচ্ছে না। বাসে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কোনো ব্যবস্থাও নেই। অতিরিক্ত বা দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার নিয়ম না থাকলেও বাসগুলো যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। অফিস শুরু ও ছুটির সময়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাত্রী পরিবহনও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি বাসগুলোতে বাতাস চলাচলের জন্য ভেন্টিলেশন ব্যবস্থাও নেই। এসব দেখে মনে হবে দেশে করোনোর সংক্রমণ থাকলেও গণপরিবহনে যেন তা নেই। সবমিলিয়ে করোনা সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েই চলছে গণপরিবহন।

এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানাটা খুবই জরুরি। তা না হলে গণপরিবহনের মাধ্যমে করোনা গণহারে ছড়াবে। একজন মানুষ একাধিক মানুষকে সংক্রমিত করবে। এর মধ্যে আবার লক্ষণবিহীন রোগীও আছে। বিশেষ করে শীতে যে সেকেন্ড ওয়েভ বা করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব গণপরিবহন তখন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অধিক সংখ্যক মানুষ করোনায় নতুন করে সংক্রমিত হতে পারে।

রাজধানীতে সরেজমিন দেখা গেছে, প্রতিটি গাড়ির সামনে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ম-কানুনের চার্ট ঝোলানোর কথা থাকেলও অধিকাংশ গাড়িতে তা নেই। যাত্রী, গাড়িচালক, সহকারী অনেকেই মাস্ক ছাড়াই চলাচল করছেন। অধিকাংশ গাড়ির বেহালদশা। অপরিষ্কার, ময়লা, সিটের কাপড়ে দুর্গন্ধ। তাছাড়া কোনো পরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটাতে দেখা যায়নি। রাজধানীর সাতরাস্তা, নাবিস্কো, মহাখালী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটর এলাকায় এই চিত্র চোখে পড়েছে।

এ ব্যাপারে তেজগাঁও নাবিস্কো বাসস্ট্যান্ডে গুলিস্তান থেকে কামারপাড়া অভিমুখী মনজিল এক্সপ্রেসের চালক শরীফ আহম্মেদ জানান, স্বাস্থ্যবিধি মানার নোটিসটি ঝুলানোই ছিল, পড়ে গেছে। মাস্ক পরার কথা বললে যাত্রীরা ক্ষেপে যান। সব সময় গাড়ি পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না।

গাড়িটিতে বসে থাকা যাত্রী সিয়াম আহম্মেদ জানান, কাজের সুবাদে তাকে প্রতিদিনই মগবাজার যেতে হয়। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব হয় না। বাসে উঠলে বাংলাদেশে করোনা আছে কি না তা বুঝা মুশকিল। গাড়িতে বেশিরভাগ যাত্রীর মুখে মাস্ক থাকে না। তাছাড়া শরীর ঘেঁষে বসে ও দাঁড়িয়ে যাত্রীরা আসা-যাওয়া করছেন।

মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায় গাজীপুর কলেজ গেইট থেকে মতিঝিল অভিমুখী একটি বিআরটিসি বাসে অর্ধেকের বেশি যাত্রী মুখে মাস্ক ছাড়া বসে আছেন। বাসে স্বাস্থবিধি মানার চার্ট নেই। এ ব্যাপারে বাসচালকের সহকারী শাহীন মিয়া বলেন, ‘অফিস থেকে এখনো কোনো স্বাস্থ্যবিধির কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি। দিলে অবশ্যই সামনে লাগানো থাকত।

একই বাসের আরেকজন সহকারী মাফুজ আহম্মেদ জানান, যাত্রীদের মাস্কের কথা বললে খারাপ ব্যবহার করেন। এ সময় তার নিজের মুখে মাস্ক না থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, মাস্ক আছে, আমাদের তো যাত্রীদের ডাকতে হয়, তাই খুলে রাখালাম। সে সময় দেখা গেল মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে যে ৮-১০ জন যাত্রী গাড়িতে উঠলেন, তাদের কারও মুখেই মাস্ক নেই।

রাজধানীর বিজয় সরণি সিগন্যালে বিআরটিসির আরেকটি বাসে দেখা গেল, বাসের ভেতর একজন হকার আমড়া বিক্রি করছেন। তার মুখে মাস্ক নেই। কারণ জানতে চাইলে আমরা বিক্রেতা ঠাট্টাচ্ছলে বলেন, মাস্ক আকাশে ওড়ে। তার পাশের সিটেই বসা রাজমিস্ত্রী মনু মিয়া ও শাহবাজের মুখে মাস্ক নেই। এর মধ্যে মনু মিয়া বলেন, মাস্ক বাসায় রেখে এসেছি। তাছাড়া করোনা আমাদের জন্য না, বড়লোকদের জন্য। যারা এসির মধ্যে থাকে তাদের করোনা হয়, আমাদের হয় না।

একই প্রসঙ্গে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, গেল মাসে আমাদের হিসাব অনুযায়ী ৪০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহনে মাস্ক ছাড়াই চলছেন। তবে এখন এ সংখ্যাটি আরও বাড়ছে। রাজধানীতে ৩০ ভাগ গাড়ির জানালার গ্লাস ভাঙা। এ মুহূর্তে গাড়িগুলোকে পরিষ্কার রাখাটাও অতি জরুরি।  

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার স্বাস্থ্যবিধি মানার আইন তৈরি করছে ঠিকই তবে এসব কার্যকর করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেই বলে তিনি মনে করেন। সরকারের পাশাপাশি এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত