হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে রপ্তানির পণ্যের চালান থেকে অ্যামফিটামিন (ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান) উদ্ধার মামলার তদন্তে নেমে একটি আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (এনডিসি)। ইতিমধ্যে চক্রটির দেশীয় হোতাসহ ১৫ জনকে শনাক্ত করে তার মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ওই চক্রের অন্যতম সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারী দাশ সিং নামে এক মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) সহায়তা চাওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ফেডেক্স এক্সপ্রেস কুরিয়ারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানের কার্গো ফ্লাইটে হংকং হয়ে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর পথে ধরা পড়ে ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম অ্যামফিটামিনের একটি চালান। যার বাজারমূল্য ২৪ কোটি টাকা বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তৈরি পোশাকের কার্টনে দেশের বাইরে যাচ্ছিল ওই মাদক। বিমানবন্দরে রপ্তানি কার্গো ভিলেজে স্ক্রিনিংয়ে ধরা পড়ে পোশাকের ভাঁজে বিশেষভাবে লুকানো ওই মাদক।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আমদানি-রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচয়দানকারী মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জুনায়েদ ইবনে সিদ্দিকী আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি চক্রের দেশীয় হোতা। তার চক্রের সদস্য হিসেবে অসাধু কেমিক্যাল ব্যবসায়ী, কুরিয়ার সার্ভিস কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের লোডারসহ ১৫ জনের অ্যামফিটামিনের চালান পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ঢাকা-মেট্রো) উপপরিচালক আহসানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ এই অ্যামফিটামিন পাচারচেষ্টায় একটি আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত রয়েছে। এ চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আরও একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
এ মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মাদকের চালানটি ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে অস্ট্রেলিয়াতে পাচার হচ্ছিল। কাজেই এ চক্রে একাধিক দেশের লোকজন জড়িত।’
গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা ওষুধের বিভিন্ন কাঁচামাল ভারত থেকে আমদানি করে থাকেন। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন জুনায়েদের চক্রের সদস্য অসাধু কেমিক্যাল ব্যবসায়ী পুরান ঢাকার মিটফোর্ডের আবুল কালাম আজাদ ওরফে বান্টি। তিনি ভারতের চেন্নাই থেকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ওষুধের কাঁচামাল ফেনোফাইব্রেট ঘোষণা দিয়ে অ্যামফিটামিনের চালান রাজধানীর মিটফোর্ডে নিয়ে আসেন। পরে সহযোগী নজরুলের মাধ্যমে সরবরাহ করেন মোহাম্মদপুরের জান্নাত ভবনের মালিক জুনায়েদের কাছে। এরপর তিনি চালানটি নিয়ে যান তার বাড়ি জান্নাত ভবনে। সেখানে গার্মেন্টস পণ্য হিসেবে জিন্স প্যান্টের কার্টনে বিশেষ কৌশলে এ মাদক প্যাকেজিংয়ের কাজ করেন বাবুল ও বাপ্পী নামে জুনায়েদের অন্য দুই সহযোগী। জিন্স প্যান্ট ঘোষণা দিয়ে এই কার্টনগুলো উত্তরার নেপচুন ফ্রেইট লিমিটেড প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান বাবুল। তারপর সেখান থেকে ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজী শামছুল আলমের কাছে নিয়ে যান রুবেল নামে জুনায়েদের আরেক সহযোগী। এরপর গাজী শামছুল আলম (যিনি ফেডেক্সের এজেন্ট) তা নিয়ে যান মতিঝিলে ফেডেক্সের নির্বাহী পরিচালক (হিসাব) খন্দকার ইমতিয়াজের কাছে। তারপর চালানটি সেখান থেকে গত ৯ সেপ্টেম্বর ফেডেক্সের মাধ্যমে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ হয়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি দাশ সিংয়ের কাছে পাঠানোর চেষ্টা হয়। তবে শেষমেশ তা আর সম্ভব হয়নি। চালানটি ধরা পড়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে ফেডেক্সের নির্বাহী পরিচালক (হিসাব) খন্দকার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের জিএম গাজী মো. শামছুল আলম, রপ্তানি কার্গো ভিলেজের লোডার রাসেল মাহমুদ, কাজল টি গোমেজ এবং হেলপার মো. হামিদুল ইসলাম ও কাজী নজরুল ইসলামকে। পরবর্তী সময়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে গ্রেপ্তারদের কারাফটকে তিন দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেন অ্যামফিটামিনের চালান উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় করা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা উদ্ধার হওয়া অ্যামফিটামিনের উৎস ও গন্তব্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম দফায় গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পরে বাবুল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যিনি মোটা অঙ্কের কমিশনের ভিত্তিতে মাদকের চালানটি বুকিং দিয়েছিলেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রুবেল নামে আরেকজন শনাক্ত হয়। তাকে আটকের চেষ্টা চলছে।
এদিকে গত ৪ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের জান্নাত ভবনে অভিযান চালিয়ে ওই মাদক পাচার চক্রের দেশীয় হোতা জুনায়েদ, তার সহযোগী নজরুল, বাবুল ও বাপ্পীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৬ অক্টোবর মিটফোর্ডের কেমিক্যাল ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ ওরফে বান্টিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার জুনায়েদ, বান্টি, নজরুল, বাবুল ও বাপ্পীকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মাদকের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে জানতে পারেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা আরও জানান, একই চক্রের সদস্যরা আগেও একাধিক মাদকের চালান দেশের বাইরে পাচার করেছেন। প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, এ চক্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়াতে মাদকের চালান পাঠিয়েছে। তবে তারা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সবকিছু স্বীকার করলেও আদালতে গিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুনায়েদের চক্রে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ও কার্গো ভিলেজের একাধিক লোডার রয়েছেন। এছাড়া তার চক্রের সদস্য হিসেবে ভারতীয় মাদক কারবারি চক্রের অনেক সদস্য রয়েছেন। ভারতীয় সদস্যদের মাধ্যমেই এ ধরনের মাদক দেশে এনে বিভিন্ন দেশে পাচার করে থাকে।’
অ্যামফিটামিন উদ্ধারের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক ফজলুল হক বলেন, ‘অ্যামফিটামিন পাচারচেষ্টা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে একাধিক আসামিকে দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে আবারও রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী দাশ সিংকে আইনের আওতায় আনার জন্য ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।’
