করোনা গবেষণার ফল আমলে নিন

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২০, ১১:৩৫ পিএম

মার্চ মাসে দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের সময় থেকেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি, মহামারী আকারে কভিড-১৯ রোগের বিস্তার, হার্ড ইমিউনিটি এসব নিয়ে জনমনে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়েছে। যথাযথ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের অভাব এসব নিয়ে নানা ভ্রান্তিরও জন্ম দেয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে  সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য-বিবৃতিও করোনা নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক ভাবনার রসদ জুগিয়েছে। দেশে করোনা সংক্রমণের হার নিয়ে সরকারি তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য তা নিয়েও সন্দেহ ছিল মানুষের মনে। এছাড়া নাগরিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে করোনা সংক্রমণের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জিত হবে কি-না এই জিজ্ঞাসাও মানুষকে ভাবিয়েছে। দেশে করোনা শনাক্তের সাত মাসের মাথায় এসে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) এক যৌথ গবেষণার ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে এখন এসব বিভ্রান্তি দূর করা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হলো। বিশেষত আসন্ন শীতকালে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এই গবেষণার ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

সোমবার আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর’বি-এর যৌথ গবেষণার ফলে যেসব তথ্য প্রকাশ হয়েছে তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে যে রাজধানী ঢাকার অর্ধেক মানুষের এরই মধ্যে করোনা হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তা প্রতিহত করার জন্য রক্তের শ্বেতকণিকা অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এর মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জন্ম নেয়। অ্যান্টিবডি শনাক্তের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছিলেন কি-না, তা জানা যায়। এই গবেষণায় শ্বাসতন্ত্রের তরল পদার্থ (আরটি-পিসিআর) এবং রক্তের নমুনা পরীক্ষার (অ্যান্টিবডি) মাধ্যমে সংক্রমণের তথ্য জেনেছেন। এভাবে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফলাফল বলছে, তিন মাস আগেই রাজধানীর ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অথচ সরকারি হিসাবে সোমবার পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই লাখের কম। আর গবেষণার ফল বলছে, এই সংখ্যা প্রায় এক কোটি। যৌথ গবেষণাটিতে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তথ্যের পর্যালোচনা করা হয়েছে। ফলে সংক্রমণের এই হার অনুসরণ করলে অনুমান করা যায় মধ্য-জুলাইয়ের পরবর্তী প্রায় তিন মাসে ঢাকায় সংক্রমণের বিস্তার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এই গবেষণায় একইসঙ্গে উঠে এসেছে যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে করোনার সংক্রমণ প্রায় সমান। আরও দুটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো করোনায় আক্রান্তদের ৮২ শতাংশের কোনো উপসর্গ নেই এবং ঢাকা মহানগরের বস্তিবাসী মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ইতিমধ্যে করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন।

যৌথ এই গবেষণার ফল এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো যখন শীতকালে ইউরোপীয় দেশসমূহ এবং দক্ষিণ এশিয়াতেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। আসন্ন শীতকালের করোনায় আবারও ‘লকডাউনের’ মতো পরিস্থিতির অবতারণা হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। এই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য গবেষণার ফল অবশ্যই যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, এই গবেষণার তথ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উপকৃত হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গবেষণার ফলের ভিত্তিতে কী ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। খেয়াল করা প্রয়োজন, গবেষণার ফল প্রকাশের পর শীর্ষ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নাগরিকদের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠার কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না এবং সংক্রমিত ব্যক্তিদের শরীরে কতদিন অ্যান্টিবডি থাকবে, তা-ও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। ফলে ঢিলেঢালাভাবে করোনা মোকাবিলা করেও পার পেয়ে যাওয়া যাবে এমন ভাবনার কোনো সুযোগ নেই। বরং শীতকালের করোনা যে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সেটা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি জোরদার করা উচিত। 

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, শীতকালে করোনার সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমান প্রস্তুতি আশাব্যঞ্জক নয় মোটেই। করোনার চিকিৎসায় সারা দেশের জেলা-উপজেলায় আইসিইউ, ভেন্টিলেটর  এবং হাই ফ্লো অক্সিজেন ন্যাজাল ক্যানোলা নিশ্চিত করতে মহামারী বিশেষজ্ঞরা জোর দিলেও সরকার সেই পথে হাঁটছে না। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতিতে আইসিইউ স্থাপনের অগ্রাধিকার নেই। তারা মূলত হাই ফ্লো অক্সিজেন ন্যাজাল ক্যানোলা ও সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন সরবরাহের ওপরই জোর দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা এবং হাসপাতাল সেবা কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে সব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক আইসিইউ স্থাপন করা জরুরি। একইসঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত