নির্দেশ জারি করে ক্ষমতা প্রদর্শন করার প্রবণতা অনেক পুরনো। রাজকীয় ফরমান ছিল সব যুক্তির ঊর্ধ্বে, রাজার ইচ্ছাই সেখানে ছিল আইন। রাজার ইচ্ছায় দেশ চলবে নাকি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে আইনে এই বিতর্ক থেকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামেরও মূল চেতনাতে তাই ছিল। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সেই অবিস্মরণীয় প্রতিবাদী গান, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, বাঙালি জাতিকে প্রতিবাদমুখর করে তুলেছিল। মুখের ভাষা আর মনের ভাব প্রকাশের জন্য সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছিল চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা নামে ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে।
আইনপ্রণয়নের সংস্থার নাম জাতীয় সংসদ। বাংলাদেশের সংসদে আইন প্রণয়নের জন্য মাত্র ৯ শতাংশ সময় ব্যয় করলেও দ্রুতগতিতে আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে এগিয়ে। একটি আইন পাস করতে সময় লাগে মাত্র ৩২ মিনিট, যেখানে ভারতে লাগে ১৮৬ মিনিট। তারপরও আইনের বাইরে ফরমান যে কত জারি হয়, তার ইয়ত্তা নেই। এ রকম একটি ফরমান জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ৭ অক্টোবর, ২০২০ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার-সংক্রান্ত এক নির্দেশনা জারি করেছে। একটা দারুণ ভূমিকার অবতারণা করে তারা বলেছেন, ‘যুগোপযোগী ও আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার পাঠদান এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অনেক ভূমিকা পালন করা হয়।’ এটুকু পড়ে হতবাক হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’-এ অনেক ভূমিকা পালন করা হয়, তাই কি? যেকোনো নীতি প্রণয়ন করতে গেলে বিতর্ক অবশ্যম্ভাবী। তাহলে স্বীকার করে নেওয়া হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক করা হয়। বিতর্ক মানে বিপরীত মতপ্রকাশের সুযোগ থাকা। নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তাহলে ঘাটতি দুর্বলতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা করা হয় এবং এর মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কাজটাও করা হচ্ছে তাহলে। এ পর্যন্ত আলোচনা করলে মনে হবে যে, এত চমৎকার ও গণতান্ত্রিক একটি ফরমানের জন্য বিশ্বদরবারে আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। জীবনের আনন্দগুলো বড়ই ক্ষণস্থায়ী। উচ্ছ্বাস কেটে গিয়ে এই আনন্দ আতঙ্কে রূপ নিতে বাধ্য পরের ছয়টি দফা নির্দেশনা পড়লে। ‘ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য নিম্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার-সংক্রান্ত কিছু নির্দেশনা প্রদান করা হলো’ এই বাক্যের পরে যে ছয়টি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, তা যতটা না ‘সচেতনতা’ সৃষ্টির জন্য, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ‘সতর্কবার্তা’ দেওয়া জন্য তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবে না। আক্কেলজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের জন্য নাকি ইশারাই যথেষ্ট!
এক নম্বর নির্দেশনাটা একমাত্র নির্দেশনা হলে আর কোনো নির্দেশনা জারি করার প্রয়োজনই ছিল না। বলা হয়েছে, ‘সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’ এই নির্দেশনা থেকে কি মনে হয় এটা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো সার্কুলার? রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মহলের প্রতি কোনো ভরসা কি তারা রাখতে পারছেন না, নাকি ফরমান জারি করার এক প্রচণ্ড আকুলতা তাদের মধ্যে কাজ করছে? ফেইসবুকে কী লিখলে কী হয়, তা কি দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করছেন না? আমাদের রাষ্ট্রটাকে একটা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান ভেবে তারা কি খুব সাবধানে কথা বলতে বলছেন, যাতে কোনোভাবেই ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়? পরের বাক্য তো আরও সতর্কবাণী দিচ্ছে। ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সার্ভিস বা পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পোস্ট দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।’ বুঝে নিন এবার! দুর্নীতি করলে, ভুল সিদ্ধান্ত দিলে তার ব্যাপারে কিছু লিখলে যদি সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হেয়প্রতিপন্ন হন, তাহলে কিন্তু বিপদ আছে!
দুই নম্বর নির্দেশনাটাও কম ভয়ানক নয়। রাষ্ট্র কি ভয় পাচ্ছে যে ছাত্ররা এমন কিছু লিখতে পারে, যা জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী? তার জন্যও তো আইন আছে। কিন্তু না, মাউশিকেও বলতে হলো ‘জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনো রকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’ আচ্ছা, তিন ধারার শিক্ষা যা চালু আছে, তা কি জাতীয় ঐক্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? তাহলে শিক্ষার্থীর মনে যদি এমন প্রশ্ন জাগে এবং সে যদি ফেইসবুকে তা নিয়ে লেখে, তাহলে কি তা অপরাধ হবে? ‘কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে বা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিপন্থী কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না’ এই বাক্যটি পরস্পরবিরোধী হয়ে গেল না? ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও তো দেখি অনেকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তখন কী হবে? ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও, ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে’ এ কথা কে বলছেন, কার উদ্দেশে বলছেন! এটা দেখার দায়িত্ব কার? আমাদের দেশে সংখ্যালঘুর ধর্মীয় অনুভূতি বলে কিছু নেই, সব সময় সংখ্যাগুরুরা অনুভূতিতে আঘাত পান এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এটাই তো দেখে আসছে জনগণ এত দিন। মিথ্যা প্রচারে আক্রান্ত হয়েছে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বহুবার। কোনো বিহিত কি হয়েছে? আবার নতুন সার্কুলার মাউশিকে দিতে হচ্ছে কেন?
তিন নম্বর নির্দেশনা নিয়ে কোনো কথা নেই। ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমলেও এ কথা শুনেছে, এ ধরনের আইনের প্রয়োগ দেখেছে মানুষ ‘ জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো বিষয় লেখা... তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে।’ অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাবের ব্যাখ্যা কী, তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কথা বললে তা কতখানি প্রীতির সঙ্গে ক্ষমতাসীনরা গ্রহণ করে, তা তো আমরা জানি। আর এসব জেনে যদি কেউ বিক্ষুব্ধ হন, তাহলে কী হবে! আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখা এসব নিয়ে ব্যস্ত আছে। তারপরও মাউশির এসব নির্দেশনা দেখে একটা কথাই মনে হয়, এটা কি তাদের কাজ? এ দেশে কার কাজ কে করে! এভাবে চার, পাঁচ ও এরপর ছয় নম্বর নির্দেশনায় এসবের ব্যত্যয় হলে ‘অন্যথায় অ্যাডমিন ও পোস্টদাতা উভয়েই সরকারিবিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত হবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ শিক্ষকরা তো চাকরিবিধি অনুযায়ী একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকেন, তাহলে এ কথা কার জন্য? উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র যারা ভাবতে শিখছে, বুঝতে শিখছে, তাদের বুঝিয়ে দাও তুমি কতখানি শৃঙ্খলিত। সবশেষে বলা হয়েছে ‘এমতাবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী ও অপ্রীতিকর কার্যকলাপ যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ যাক! এখন থেকে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা নিরাপত্তা পুলিশের মতো দায়িত্ব পালন করবেন। এমনিতেই শিক্ষাদান করা ছাড়া সব কাজই তাদের করতে হতো, এখন সাইবার পুলিশের দায়িত্বও তারা পালন করবেন। কড়া নজরে রাখবেন ছাত্রদের।
সীমিত গণতন্ত্র আর কর্তাব্যক্তিদের অসীম ক্ষমতার এ দেশে এমনিতেই বাক্স্বাধীনতা আইনের দ্বারা আরোপিত বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে আছে। নতুন নতুন আইন হচ্ছে, ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে ক্ষমতাসীনদের নিরাপত্তা সুরক্ষিত হচ্ছে। এখন তরুণদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে, তোমার স্বাধীনতার সীমা কতদূর। শাসকদের ইচ্ছা যতখানি, তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ততখানি। ভাবমূর্তি রক্ষার নামে তোমার মনের ভাব শৃঙ্খলিত হবে, তুমি মূর্তির মতো নিশ্চল থাকতে শেখো। এর সাময়িক সুফল পাওয়া যাবে কি না, তা অনিশ্চিত কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মানসিক পঙ্গুত্ব অবধারিত।
ময়লায় উপচে পড়া দুর্গন্ধময় ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে যেতে নাকে হাত চলে আসে সবার। কিন্তু ময়লা পরিষ্কার না করে নাক বন্ধ করাটা কোনো কার্যকর সমাধান নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে ছাত্ররা কথা বলবে, লিখবে, বিতর্ক করবে, তবেই না পরিবর্তনের মনন গড়ে উঠবে! এই সার্কুলার সেই মনন গড়ে তুলতে এক প্রচণ্ড প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
সহজ বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ কি আমাদের সহজাত? যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেয়ে শক্তি দিয়ে দমন কড়া সহজ। যারা নিজেদের শক্তিশালী বলে মনে করেন এবং প্রচার করতে ভালোবাসেন, তাদের মধ্যে অন্যের কষ্টের অর্জন ভোগ করা, দুর্বলের ওপর শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আগ্রহ খুবই বেশি। এটা খুবই সহজ। কিন্তু তারা সমালোচনায় শুধু বিরক্তই হন তা-ই নয়, ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। সমালোচনাকারীকে শাস্তি দিতে ব্যগ্র হয়ে পড়েন। প্রশ্ন ওঠে, যদি তারা সঠিক এবং শক্তিশালীই হন, তাহলে সমালোচনায় এত বিচলিত হন কেন? ফরমান জারি করে মতপ্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা তাদের তৈরি হলো কেন? ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হলে আইন ভঙ্গ হয় এই ধারণা গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ভাঙন ধরায় না কি? অতীত তো তাই বলে।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
