সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে যুবক রায়হান আহমদের (৩৪) মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহত রায়হান আহমদের স্ত্রী কোতোয়ালি থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন। এখন পিবিআই মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে।’
এদিকে ঘটনার পরপরই এসএমপির গঠিত তদন্ত কমিটি যুবক রায়হানকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতনের প্রমাণ পায়। এএসআই আশেক এলাহী তাকে ধরে ফাঁড়িতে নিয়েছিলেন। পরে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে রায়হানের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। রায়হান এ সময় কনস্টেবল তৌহিদের মোবাইল ফোন থেকে বাসায় কল করেন। রায়হান তাকে বাঁচাতে দ্রুত ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে যেতে বলেন তার চাচা হাবিবুল্লাহকে। এরপর হাবিবুল্লাহ দ্রুত ফাঁড়িতে গেলেও রায়হান অসুস্থ হওয়ায় তাকে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। পরে হাসপাতালে গিয়ে তিনি রায়হানের লাশ দেখতে পান। এসএমপির তদন্ত কমিটির কাছে প্রথমে বিষয়টি ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা অস্বীকার করে। পরে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো হলে তারা বিষয়টি স্বীকার করে। এর ভিত্তিতে ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেনকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান, এসএমপির উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ জানান, তদন্তের আলোকে তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফাঁড়ির বরখাস্ত করা ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া গতকাল মঙ্গলবার থেকে লাপাত্তা রয়েছেন বলে পুলিশের একটি সূত্র জানায়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ। তবে আকবর হোসেন লাপাত্তা কি না সে বিষয়ে স্পস্ট কোনো বক্তব্য দেননি পুলিশ কর্মকর্তারা। এ ব্যাপারে এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, ‘তিনি লাপাত্তা কি না, সেটা আমার জানা নেই।’
এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার ভগাইর গ্রামের বিএনপি নেতা জাফর আলী ভূঁইয়ার ছেলে। তিনি প্রায় এক বছর আগে সিলেট বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পান। এসআই আকবর সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেছেন।
গত শনিবার রাতে নগরীর আখালিয়া নেহারিপাড়ার প্রয়াত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে নেয় পুলিশ। এরপর টাকার জন্য তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তার হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং হাত-পায়ে আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন রয়েছে। গত রবিবার সকালে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রায়হান মারা যান। রায়হান সিলেট নগরীর রিকাবীবাজারে একজন চিকিৎসকের চেম্বারে সহকারীর চাকরি করতেন। তিনি বিবাহিত ও তিন মাস বয়সী তার একটি মেয়ে রয়েছে। রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এদিকে রায়হান হত্যার বিচার এবং এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকালও সিলেটে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। দুপুরে সাধারণ ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করা হয়। বিকেলে নগরের চৌহাট্টার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করে ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’ নামের একটি সংগঠন।
