শাহবাগের চার আন্দোলন

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৫২ পিএম

বেশিদিন আগের কথা নয়। মাত্র সাত বছর আগে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই শাহবাগে একদিন মুহুর্মুহ গর্জন তুলে স্লোগান উঠেছিল ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই। স্লোগানের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের অনেক এলাকায়।

তখন সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজে নিয়োজিত। আদালতে চলছে বিচার। কিন্তু আদালতের একটি রায় মনের মতো হলো না বিচারপ্রত্যাশীদের। জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষের আপিল করারও কোনো সুযোগ ছিল না আইনে। শুধু আসামিই আপিল করতে পারবেন। আইনটি এমনই করা হয়েছিল। কিন্তু সে আইন মানতে নারাজ বিচারপ্রত্যাশীরা। তাই শুরু হলো আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত সরকার আইন পরিবর্তন করে এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল করার বিধান সংযুক্ত করে। শাহবাগের সেই আন্দোলনের মুখে সরকার আপিল করে। আপিলের রায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হয়ে তা বাস্তবায়নও হয়।

দুই. ২০১৮ সালের জানুয়ারি। আবারও উত্তাল শাহবাগ। সরকারি চাকরিতে ১৯৭২ সাল থেকে চলে আসা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চান চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে তুমুল আন্দোলন। এক পর্যায়ে সরকার বাধ্য হয় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল করতে। যদিও শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিল চায়নি কখনো। তারা চেয়েছিল কোটা সংস্কার।

তিন. ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্ট। এবারও উত্তাল শাহবাগ। স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নেমে এলো রাস্তায়। তাদের দাবি নিরাপদ সড়ক। বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সে প্রেক্ষাপটে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে প্রাণ হারায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজিব ও দিয়া। ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এমনকি দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন গড়ে উঠলেও সে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল শাহবাগ। আন্দোলনকারীদের দাবি, সড়কে ঘটে যাওয়া হত্যাকা-ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আর সড়কে নিরাপত্তা। ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্টে আন্দোলনের একপর্যায়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই একপ্রকার ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। তারা দেখিয়ে দেয়, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন কিছু না।

চার. ২০২০ সালের অক্টোবর। এবার ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন। মূল ফোকাল পয়েন্ট সেই শাহবাগ। এবার ব্যানার, ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’। তালে তালে সেøাগান উঠল ‘আমার মাটি আমার মা, ধর্ষকদের হবে না/আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকদের ঠাঁই নাই/ যে রাষ্ট্র ধর্ষক পুষে, সে রাষ্ট্র ভেঙে দাও/ ধর্ষকদের কারখানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও/ পাহাড় কিংবা সমতলে, লড়াই হবে সমানতালে, প্রীতিলতার বাংলাদেশে, ধর্ষকদের ঠাঁই নেই/ প্রতিবাদের  সেøাগানমুখে, ধর্ষকদের দাঁড়াও রুখে। প্ল্যাকার্ডে লেখা হলো নারীর কেন দুর্গতি, বিচার চাই দ্রুতগতি (প্রথম আলো)।

এ দেশে সড়কে হত্যার মতোই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ধর্ষণ। সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে তার তরুণী স্ত্রীকে ছাত্রলীগ নেতাদের গণধর্ষণ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে ধর্ষণ ও বিবস্ত্র করে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হাতে নারকীয় নির্যাতনসহ সারা দেশে ধর্ষণ-নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে গড়ে ওঠে এ আন্দোলন।

গত এক যুগ ধরে অব্যাহত ধর্ষণের সঙ্গে একের পর এক জড়িয়ে পড়তে থাকে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নাম। সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রলীগ নেতাকর্মী, নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও বেগমগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা, পটুয়াখালীর বাউফলে যুবলীগ নেতা, বগুড়ার শ্রমিকলীগ নেতা তুফান এমন অনেকগুলো ব্যাপক আলোচিত ধর্ষণের হোতা সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। তাই অনেকেই মনে করেন এরা সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে ধর্ষণ করছে। সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয় ছাড়া এতগুলো ধর্ষণে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা যুক্ত হতে পারত না। এর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুরুতেই কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি সরকার। মিডিয়ায় আসার পরে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হওয়ায় কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। তাও ধর্ষণের মতো মহামারী বন্ধে যথেষ্ট নয়। তাই এই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের দাবি ও একই সঙ্গে অভিযোগের তীর সরকারের দিকেই।  

এবার দেখা যাক, এই চার আন্দোলনের কোনটাতে সরকার ও সরকারি দলের ভূমিকা কী ছিল।

২০১৩ সালে সংঘটিত গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনটি চলছিল একটি বিচারাধীন বিষয় নিয়ে। সরকারের করা আইন ও আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে শুরু হয়েছিল সেই আন্দোলন। কিন্তু তাই বলে সরকার তাদের বলে দেয়নি যে, সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিজ উদ্যোগেই যুদ্ধাপরাধীর বিচার করছে। এ নিয়ে আন্দোলন করে শাহবাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা মাসের পর মাস দখল করে রেখে জনভোগান্তি বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বরং সরকার সেই আন্দোলনে সব রকমের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। সরকারের কাছে আইন পরিবর্তন ও সঠিক বিচারের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। আর সে আন্দোলনে সরকার তেল ঘি ঢেলেছে।

এবার আসা যাক বাকি আন্দোলনগুলোর বিষয়ে সরকারের ভূমিকা কী ছিল সে বিষয়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলন বিষয়ে জাতীয় সংসদে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা পর্যন্ত বলেছেন, রাজাকারের বাচ্চারা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরোধিতা করে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী জাতীয় সংসদেই বলেছিলেন, রাজাকারের বাচ্চাদের দেখ নেব (বাংলা ট্রিবিউন, ১০ এপ্রিল ২০১৮)। মতিয়া চৌধুরীর মতো প্রভাবশালী মন্ত্রী এভাবে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর এ দেশে কী হতে পারে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। পুলিশ ও ছাত্রলীগের অসংখ্য আক্রমণের মুখে পড়েছিল সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে পিছু হটেছিল সরকার।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের শুরুটা ছিল একেবারেই অহিংস। কিন্তু সেই আন্দোলনে ছাত্রলীগ ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি সাংবাদিক, শিশু ও নারীরা পর্যন্ত। পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের যৌথ আক্রমণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বহু জায়গায় নারকীয় অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। মামলার শিকার হয়েছিল অনেক শিক্ষার্থী। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক শহিদুল আলমকে পর্যন্ত সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছিল। 

আন্দোলনের মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতুদন্ড করার ঘোষণা দিলেও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন সরকারের রোষানলে পড়ে গেছে। ধর্ষণ নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজনকে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাই এ নিয়ে আর আন্দোলনের দরকার নেই।

এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কোনো পোস্ট ভার্চুয়াল মিডিয়ায় দিতে পারবে না বলেও নির্দেশ জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও প্রকাশ করা হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি। বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সদিচ্ছা থাকার পরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে যে পুলিশ ছাড় দেবে না সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও দৃশ্যমান হয়েছে ইতিমধ্যেই।

১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার যেমন দরকার ছিল কলঙ্কমোচনের জন্য, তেমনি বাকি আন্দোলনগুলোর ন্যায্যতাও কোনো অংশে কম ছিল না। অথচ একটি আন্দোলনে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দিল আর বাকিগুলো হচ্ছে সরকার দ্বারা পদপিষ্ট! আমরা যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে চাই, তেমনি চাই ধর্ষণমুক্ত, সড়কে হত্যামুক্ত একটি দেশ।

লেখক চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত